রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নতুন কাঁচা বাজার কৃষি মার্কেট গড়ে উঠেছে উত্তর সিটি করপোরেশনের জমির ওপর। ২০২৩ সালে এই বাজারে আগুন লাগার পর এই মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনের অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে দ্বিতল পাকা ভবন তুলে সেখানে শত শত দোকান বিক্রি করে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছে একটি সিন্ডিকেট। প্রতিটি দোকান প্ৰায় ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি বিক্রি হয়েছে বলে জানা যায়। অথচ বর্তমানে প্রায় ৪০০ দোকান থাকা এই মার্কেটের কোনো রাজস্ব আদায় করছে না সিটি করপোরেশন। এতে সিটি করপোরেশনের জমির সঠিক ব্যবহার না হওয়া দোকান বরাদ্দ ও মাসিক সালামি আদায় না করায় প্রায় শত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন।
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এরপর সেখানে অস্থায়ীভাবে ছাতা ও তাঁবু টানিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দোকান করার সুযোগ করে দেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৎকালীন মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। সে সময় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নগর কর্তৃপক্ষের অলিখিত চুক্তি ছিল, অস্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য খোলা জায়গায় চকি বসিয়ে, ছাতা টানিয়ে দোকান করা যাবে। কিন্তু এখন সেখানে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে সেখানে দুইটি ব্লকে দ্বিতল দুইটি ভবন উঠেছে। এর মধ্যে নিচতলায় খ ও গ ব্লক নাম দিয়ে প্রায় ৩ শতাধিক দোকান পরিচালনা হচ্ছে। আর ক ব্লকের নাম দেওয়া দোকানগুলো শুধু টিনের ছাপড়ার মধ্যে চলছে। সেখানেও প্রায় শতাধিক দোকান রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের জায়গায় মার্কেট নির্মাণ করার জন্য নগর কর্তৃপক্ষের মার্কেট নির্মাণ সেল রয়েছে। এ সেল প্রথমে যেখানে মার্কেট নির্মাণ করা হবে তার একটি সমীক্ষা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। এরপর নকশা তৈরি করা হয়। নকশায় মার্কেটটি কত তলা ভবন হবে, মার্কেটের কোথায় কী থাকবে সেগুলো চিহ্নিত করা হয়। এর পর এটি আবেদনের ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কৃষি মার্কেটের ক্ষেত্রে ডিএনসিসির মার্কেট নির্মাণ সেল কিছুই জানে না। এটি একটি সিন্ডিকেট নির্মাণ করে সেটি বিক্রিও করে দিয়েছে।
আগুন লাগার আগে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে মোট ৩১৭টি দোকান ছিল। ক, খ ও গ—এই তিনটি ব্লকের মধ্যে দুটি ব্লকের সব দোকান আগুনে পুড়ে যায়। এরপর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং ডিএনসিসি নগর কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেয় এবং অস্থায়ীভাবে দোকান বসানোর সুযোগ দেয়। জানা গেছে, সেই সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ী ও নগর কর্তৃপক্ষের কতিপয় কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর সলিম উল্লাহ সলুর প্রত্যক্ষ মদতে গড়ে তোলা হয় পাকা মার্কেট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এরই মধ্যে নিচতলার নির্মাণকাজ শেষে কসমেটিকস, জুয়েলারি, কাপড়, ব্যাগ, মুদিসহ বিভিন্ন দোকান চালু হয়েছে। দুটি ব্লকে দোতলার নির্মাণকাজ চললেও দোতলার দোকান চালু হয়নি। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ভবনের ২য় তলার সামনের অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে নিচ তলা পুরোপুরি চালু রয়েছে।
জানা গেছে, কৃষি মার্কেটে নিজের নামে একাধিক দোকান দখল করে নিয়েছিলেন ডিএনসিসির সাবেক ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু। পরে এই অবৈধ দোকানগুলো চড়া দামে তিনি বিক্রি করে দেন। এ ছাড়া তার ভাই এবং আত্মীয়স্বজনও দোকান দখল করেছেন। তারাও সেগুলো বিক্রি করে দেন। কৃষি মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি ছিলেন সলু। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর তিনি গা ঢাকা দিয়েছিলেন। পরে একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর কৃষি মার্কেটে মোহাম্মদপুর নতুন কাঁচাবাজার দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাহী কমিটি গঠনের জন্য তলবি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নবগঠিত ১৩ সদস্যের কমিটিতে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন ঢাকা মহানগর উত্তর ২৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি মো. মামুন হোসেন। এ ছাড়া আব্দুল হান্নানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান বলেন, এখনো এই মার্কেটের বৈধতা সিটি করপোরেশন দেয়নি। আমার ৩-৪ টা দোকান আছে। আমি এ বিষয়ে তেমন আর কিছু বলতে পারব না। এ বিষয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিবুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, এখানে আসলে শরীরের জোরেই এই মার্কেট তোলা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের জমিতে এই মার্কেট সম্পূর্ণ অবৈধ মার্কেট। তৎকালীন সাবেক পলাতক কাউন্সিলর এটি করেছে। আমাদের কোনো অনুমোদন নেই।

