টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চাই ভূমিতে নারীর অধিকার

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৫২

ভূমিতে নারীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্র নিশ্চিত হবে। উন্নয়নের ভিত মজবুত করতে হলে সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করতে হবে। বৈষম্য কমিয়ে নারীর জন্য সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে না। তাই নারীর ভূমি, কৃষিসহ সব অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন। তারা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোর প্রতিশ্রুতি যদি হয় কাউকে পেছনে ফেলে নয়, তাহলে ভূমিতে নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। 

ভূমি ও কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে, ভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে। নগদ অর্থের হাতছানিতে কৃষি থেকে পুরুষের সম্পৃক্ততা কমে যাচ্ছে। পুরুষের অবর্তমানে দুর্বল এই কৃষি খাতে নারীদের সম্পৃক্ততা দ্রুত হারে বাড়ছে। গত সাত বছরে কৃষি খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি খাতের ২১ ধরনের কাজের মধ্যে ১৭টিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। কৃষিতে নারীর সর্বাধিক অবদান থাকা সত্ত্বেও ভূমিতে নারীর মালিকানা, প্রবেশাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নেই। ভূমির মালিকানা এবং কৃষিতে স্বীকৃতি না থাকার কারণে নারী প্রয়োজনীয় ঋণ ও অন্যান্য কৃষিসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি বাজারব্যবস্থায়ও তাদের অংশগ্রহণ নেই।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৭-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৮ লাখ ৪৯ হাজার নারী দিনমজুর শ্রমিক রয়েছেন। অপর দিকে নারী শ্রমশক্তির ৭৮ ভাগ এখন কৃষি খাতে নিয়োজিত। পারিবারিক কাজে ৮০ ভাগেরও বেশি হচ্ছে নারী শ্রম। পুরুষের সমান কাজ করেও নারীরা মজুরি কম পান। প্রান্তিক যেসব নারীর নিজস্ব জমিজমা নাই, তারা দিনমজুর হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা দীর্ঘ সময় কাজে নিয়োজিত থাকার পরও তারা মজুরি-বৈষম্যের শিকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাসজমি নীতিমালায় বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীর জন্য সক্ষম পুত্রের শর্ত বাতিল করে কৃষিনির্ভর সব ভূমিহীন দরিদ্র নারীকে কৃষি খাসজমিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বেহাত হয়ে যাওয়া খাসজমি পুনরুদ্ধার এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ জোরদার করতে সুনির্দিষ্ট আইন করতে হবে। কৃষি নীতিমালা সংশোধন করে নারী কৃষকের সুস্পষ্ট সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান, সরকারি সেবাগুলো নারীর অন্তর্ভুক্তি ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করাসহ নারী কৃষকের ভূমিহীনতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় জামানতবিহীন অথবা সহজ শর্তে সরকারি ব্যাংক থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর জন্য বৈষম্যমমূলক পারিবারিক আইন পরিবর্তন করে অভিন্ন পারিবারিক আইন করতে হবে।

তারা বলেন, গ্রাম থেকে শুরু করে শহরে, কৃষি কাজ থেকে গার্মেন্টস শিল্প—সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছে এবং মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। জীবনসংগ্রামে নারীরা সম্মুখযোদ্ধার অবস্থানে থাকলেও সম্পদের ওপর নারীর অধিকার এখনো অনেক খানি দূরের স্বপ্ন হয়ে রয়ে গেছে। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদান উল্লেখযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ভূমিহীনতা, নিরাপত্তাহীনতা নারীকে প্রান্তিক অবস্থায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, উন্নয়ন সূচকে আমরা এগিয়ে আছি। প্রবৃদ্ধি এখন ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। কিন্তু সেই সঙ্গে বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫-১৬ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্যের ব্যবধান ১২১ গুণ বেড়েছে। ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ ১৯৮৪তে নারীর অন্তর্ভুক্তি যুক্ত করতে হবে। তাছাড়া অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। যদিও সংবিধানে সমতা ও সাম্যের কথা বলা আছে। শিশু ও নারী ধর্ষণ ও হত্যার প্রবণতা সংখ্যায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সব নারী সংগঠনকে একত্রিত হয়ে নিরাপত্তাসহ নারীর সব অধিকার প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

এএলআরডির নিবার্হী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, কৃষির আবিষ্কারক নারীর জন্য আইন তৈরি করে হলেও কৃষিঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু প্রবৃদ্ধি দিয়ে উন্নয়নের আসল চেহারা বোঝা যায় না। বৈষম্য চিহ্নিত করে তা দূর করতে হবে। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে হবে।