শীতল যুদ্ধ যুগে যখন বলা হতো যুক্তরাষ্ট্রের আরো সংযত ও মার্জিত পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা উচিত, নীতি নির্ধারক মহলে সেটা খুব কমই মনোযোগ আকর্ষণ করত। ১৯৫০, ৬০ বা ৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের প্রতি কঠোর নীতি অনুসরণ করত। ‘সংযম বা ধৈর্যশীল রাজনীতি’র দৃষ্টিভঙ্গিটি ঐ সময় প্রসার লাভ করে।
শীতল যুদ্ধ যুগে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে সুর নরম করতে বলার অবকাশ বেশি ছিল না। সময়টা ছিল দুই পরাশক্তির লড়াইয়ের। নিজের অবস্থান সংযত করে অপরকে সুবিধা করে দেওয়ার ঝুঁকি কেউ নিতে আগ্রহী ছিল না। তবে ঐ সময়ও হ্যানস মর্গেনথাও, জর্জ কেনান, কেনেথ ওয়াটজ, ওয়াল্টার লিপম্যান ও অন্যান্য রিয়েলিস্টরা খোলাখুলিভাবেই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করতেন। ভিয়েতনামনীতি নিয়ে তারা রাখঢাক ছাড়াই ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। তারা একটি পরিশীলিত ও সামরিক শক্তির ওপর কম নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতির সমর্থক ছিলেন। তারা চাইতেন যুক্তরাষ্ট্র বহির্বিশ্বে প্রভাব ধরে রাখতে বিশাল অঙ্কের খরচ না করুক, খরচ কিছু কমাক। তবে শীতল যুদ্ধের যুগে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুই দলই সমাজতন্ত্র উত্খাত করতে নীতিগতভাবে একমত ছিল। তাই এর বাইরে অবস্থান নেওয়া বেশির ভাগ রাজনীতিবিদেরই সম্ভব ছিল না।
সংযতবাদী বা বাস্তববাদী একটি ধারা মার্কিন রাজনীতিতে বরাবরই ছিল। তবে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতে তারা উচ্চকণ্ঠ ছিল না। তারা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব বিরোধী তা নয়, অথবা দেশটির সামরিক ক্ষমতা খর্ব হোক এটাও তারা চাইত না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র যেন বৈদেশিক ইস্যুতে কম জড়ায়। তাদের পক্ষে জোর গলার কথা বলার সুযোগ বলতে গেলে ছিল না। তবে ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে যেভাবে একলা চলার নীতি অনুসরণ করেছেন সেটি ধৈর্য্যশীল রাজনীতির সমর্থকদের প্রত্যাশার মাত্রা বহুদূর ছাড়িয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ট্রাম্পের নীতি ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। এই নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল ট্রাম্পের সময়। তবে ঝামেলায় না গিয়ে ‘সুখে শান্তিতে’ দেশ চালানোর পক্ষপাতি ছিলেন তিনি।
এমআইটির প্রফেসর ব্যারি আর পোসেনের ২০১৪ সালে লেখা ‘রিস্ট্রেইন্ট :এ নিউ ফাউন্ডেশন ফর ইউএস গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ বইতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুকে যেভাবে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সেটি এই বইয়ের অন্যতম প্রতিপাদ্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর মুক্তবিশ্বের ধারণাটি জোরালো হবে এটা আশা করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। বরং দ্বিমেরু বিশ্বের ধারণাটি প্রচ্ছন্নভাবে থেকে গেছে এবং বলা যায় তা অন্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্ব এখনো মোটামুটি দুটি মেরুতে বিভক্ত। রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ এর একটি আদর্শ উদাহরণ। একে কেন্দ্র করে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও বেলারুশ অভিন্ন অবস্থানে আছে। বহুমেরু বিশ্বের ধারণাটি এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। কিন্তু দ্বিমেরু বিশ্ব যতদিন থাকবে সংযতকামীরা তা থেকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পাবে না যেমনটি তারা পায়নি শীতলযুদ্ধ যুগের সময়। মূলধারার রাজনীতিকরা তাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বা একঘরে হিসেবেই দেখে থাকেন।
ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ সংযতকামীদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা সহজ করেছে। যদিও বৃহত্ শক্তিগুলোর লড়াই এখনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাধান্য পাচ্ছে। উল্লেখিত যুদ্ধ দুটি যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজ যথেষ্ট ম্লান করেছে। গত দুই দশকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে চীনের উত্থান ঘটেছে। সম্প্রতি অর্থনৈতিক স্থবিরতা সত্ত্বেও আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে এগিয়েছে চীন। চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও ভেনেজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশের মধ্যে সহযোগিতা বেড়েছে। ইউরোপের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা প্রত্যাশামতো শক্তিশালী হয়নি। বন্ধ হয়নি গাজায় রক্ষপাত। সেখানে নিহতের সংখ্যা ৩৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। হুতিসহ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে মিলিশিয়া গ্রুপগুলো এখন সগৌরবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। চীন ও রাশিয়া এদের নেপথ্যে সহযোগিতা করছে বলে ধারণা করা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে সংযতকামীরা আসলে কী চায়? তারা চায় অনাবশ্যক যুদ্ধ এড়াতে। বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসুক সেটি তাদের বক্তব্য নয়। যেখানে যুদ্ধের বিকল্প আছে সেখানে সেটা বেছে নেওয়া উচিত। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দেশের সঙ্গে সাধারণ সম্পর্ক, কোনো দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, কোনো দেশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক আবার কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা অথবা বৈরী দেশের তালিকাভুক্ত করা তারা সমর্থন করে না। তারা চায় সব দেশের সঙ্গে অন্তত একটি সাধারণ সম্পর্ক থাকুক।
বর্তমানে কোনো দেশকে পুরোপুরি একঘরে করে রাখা যায় না। বৈরী তকমা দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে রাখলে সেই দেশগুলোর মধ্যে আবার পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার হয়। চীন, রাশিয়া ও ইরান যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আদর্শিক ভিন্নতা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে তারা একটি সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বলে দেয় সংযতকামীদের দৃষ্টিভঙ্গি কতটুকু বাস্তবসম্মত। তবে পররাষ্ট্রনীতিতে এই মতবাদের বিরোধীতাকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি আবার উল্টো। বিনা প্রয়োজনে ‘সংযম’ ধারণ করার পক্ষপাতি নয় তারা। বিশ্ব পরাশক্তি হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় অবস্থান যে কোনো মূল্যে ধরে রাখার পক্ষে তারা। একারণে যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন নীতিতে নেতাদের মধ্যে এক ধরনের স্পষ্ট বিরোধীতা সৃষ্টি হয়েছে। কখনো কখনো একেবারে বিপরীত মেরুতে থাকে তাদের অবস্থান।
