একটি আদর্শ মহানগরের মোট জায়গার ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকিতে হয়। অথচ ঢাকায় রহিয়াছে মাত্র ৭-৮ শতাংশ। কিন্তু সেইটুকু জায়গারও বড়ো একটি অংশ নানাভাবে দখল হইয়া থাকে। সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, ঢাকার মাত্র ১ শতাংশ রাস্তায় যানবাহন চলাচল করিতে পারে, বাকি সবই বেদখলের কারণে সংকুচিত হইয়া যায়। আর এই বেদখলের উল্লেখযোগ্য কারণ অবৈধ পার্কিং। সম্প্রতি ঢাকা মহানগরের ভবনগুলির গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাইবে না এবং ভবনের গাড়ি পার্কিংয়ের স্থানে দোকান বা অন্য কোনো স্থাপনা থাকিলে তাহা অপসারণের নির্দেশ দিয়াছেন হাইকোর্ট। আদালত বলিয়াছেন, ঐসব স্থাপনা সরাইয়া লইতে ভবন মালিকদের এক মাসের সময় দিয়া দুইটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করিতে হইবে। বিজ্ঞপ্তি প্রচারের পর ভবন-মালিক যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থাপনা অপসারণ করিতে ব্যর্থ হন, তাহা হইলে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে রাজউক গাড়ি পার্কিংয়ের স্থানে যেইসকল স্থাপনা থাকিবে তাহা অপসারণ করিবে। আর এই অপসারণের সকল খরচ রাজউক আদায় করিবে ভবন-মালিকের নিকট হইতেই। ইহা ছাড়া মহানগরের যেইসকল স্থানে কার পার্কিংয়ের অনুমতি নাই সেই সকল স্থানে কার পার্কিং বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ লইতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দিয়াছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গত বুধবার এই রায় দেন।
ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, ঢাকা শহরে কোনো ভবন নির্মাণ করিতে হইলে আইনানুযায়ী রাজউক হইতে নকশা অনুমোদন করাইতে হয়। ঐ নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেক শর্ত দেওয়া থাকে—যাহার মধ্যে কার পার্কিং উল্লেখযোগ্য। যদি কেহ নকশার ব্যত্যয় ঘটাইয়া কার পার্কিংয়ের স্থানটি অন্য কাজে ব্যবহার করে তাহা হইলে রাজউকের নকশা বাতিলের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রহিয়াছে। কিন্তু এই ব্যত্যয়ের ঘটনা ভূরি ভূরি ঘটিলেও কখনো নকশা বাতিলের নির্দেশ ঘটে নাই। অথচ অবৈধ এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের ফলে ঢাকার তীব্র যানজট দিন দিন আরো প্রকট আকার ধারণ করিতেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হিসাব করিয়া কয়েক বত্সর পূর্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, যত্রতত্র অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে ঢাকা সিটিতে সৃষ্ট যানজটে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ৫৩ কোটি ২০ লক্ষ টাকা!
আমাদের দেশটি বিশ্বের আধুনিক দেশগুলিতে বিদ্যমান নিয়মতান্ত্রিক স্রোতের সহিত মিশিতে চাহিলেও আমাদের মানসিকতায় এখনো মিশিয়া রহিয়াছে আধা-সামন্তবাদ। অনিয়ম ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অসুস্থ মানসিকতা আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশিয়া আছে। ‘কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট’ আমাদের বিদ্রোহী চেতনায় মিশিয়া আছে, কিন্তু এই বিদ্রোহ যে নিজেদের প্রকৃত নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনিবার—তাহা মানি না। অনেক বিশৃঙ্খলার মধ্যেও নগরবাসীকে নিয়মের বলয়ে আনিবার এই চেষ্টার জন্য উচ্চ আদালতকে ধন্যবাদ।
