যুবায়ের ইবরাহীম
সম্প্রতি বরগুনায় রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়ন বন্ড র্যাবের সঙ্গে বন্ধুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। কেউ কেউ ‘ক্রসফায়ার’ বলে মত ব্যক্ত করেন। নয়ন বন্ড নির্বিচারে রিফাত শরীফকে হত্যা করে। আবার গণমাধ্যমে বিনাবিচারে নয়নকে হত্যায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ নানা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কেউ কেউ পক্ষে বলেছেন আবার কেউ কেউ বিচারহীনতা ও আইনের শাসন বা সুশাসন নিয়েও কথা বলেছেন। সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ ভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা প্রশ্ন করেছেন যে, নয়নকে ক্রসফায়ারে হত্যা বা বন্ধুকযুদ্ধে হত্যা করলেই কি অপরাধ দমন হয়ে যাবে? আসলে নয়নরা কতটা দোষী বা অপরাধী? এরকম বহু প্রশ্ন আছে। আছে তার উত্তরও।
একজন সাধারণ নয়ন থেকে খুনি সন্ত্রাসী নয়নে পরিণত হলো এমনি এমনি? না। নিশ্চয়ই তার পেছনে বড় কোনো ছায়া আছে। যা তাকে অপরাধ করার পর নিরাপদ আশ্রয় দেয়। সাধারণ স্বভাবিক নয়নকে যে বা যারা খুনি নয়নের উন্নীত হতে সহায়তা করেছে ও সাপোর্ট দিয়েছে, তারা কারা? নয়নকে সহায়তা দেওয়ার কারণইবা কী? কেন তারা নয়নকে সাপোর্ট ও শেল্টার দিত? এসব প্রশ্ন জরুরি প্রশ্ন। এসবের উত্তর জানা বা বের করা প্রয়োজন। না হলে আমরা ক’দিন পর পর একেকজন নয়নকে খবরের শিরোনাম হতে দেখব। এক নয়নকে হত্যা করে আমরা কি কিশোর ও যুব অপরাধ রোধ বা দমন করতে পারব? নয়নের বা তার সহযোগীদের শক্তির উত্স কোথায়? কিভাবে নয়ন এত সাহসী দুধর্ষ হলো যে, প্রকাশ্যে দিবালোকে রাজপথে একজন মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করতে পারে? কী এমন বিষয় ছিল যে, রিফাতকে খুনই করতে হবে? এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে উত্স কী? কিসে তাকে মোটিভেট করল হত্যাকাণ্ডে? এসব প্রশ্নের উত্তর ও উত্স খোঁজা প্রয়োজন। কিসে তাকে সাব্বির হোসেন নয়ন থেকে নয়ন বন্ডে পরিণত করল? নয়ন তো শুধু রিফাতকে হত্যা করেনি, এরও আগে সে আরো কয়েকটা মামলার আসামি। এক টগবগে যুবক কেন খুনের পথে তার তারুণ্য ও অমিত সম্ভাবনাময় যৌবনকে ব্যবহার করল? কোন সেই সিস্টেম ও মেথড, যা তাকে খুনে ও অন্যান্য অপরাধে প্ররোচিত করল? কারা তাকে ও তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিল? কেন দিল? নয়ন ও তার গ্রুপকে কারা কোন কাজে ব্যবহার করত? কারা তাদেরকে দিয়ে নিজেদের অন্যায় অসত্ উদ্দেশ্য ও স্বার্থ আদায় করত?
পৃথিবীতে কেউ অপরাধী হয়ে জন্মায় না। একটি নিষ্পাপ শিশু কেন শৈশব-কৈশোর পাড়ি দিয়ে তারুণ্যে এসে অপরাধীর খাতায় নাম লেখায়। এর পেছনে কারণগুলো কী কী? তা খুঁজে দেখা এই সময়ে আমাদের জন্য খুবই অপরিহার্য। আমাদের পরিবেশ, চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা এবং পারিবারিক ও সামাজিক আচরণ একজন সুস্থ স্বাভাবিক কিশোর-যুবককে অপরাধী খুনিতে পরিণত করে। আমাদের সাংস্কৃতিক অবস্থা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রতিনিয়ত কী বার্তা ও শিক্ষা দেয় আমাদের তরুণ-যুব সমাজকে? কেন আমাদের মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের পাঠ দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে? আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো কি যুববান্ধব? আমাদের আইন ও বিচারব্যবস্থা কি প্রশ্নহীন? অপরাধ তদন্তের সিস্টেমটা এত স্বচ্ছ নয় কেন? এভাবে প্রশ্ন আছে আরো অনেক।
তাই শুধু বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ার আর হত্যাকাণ্ড নিয়ে শুধু প্রশ্ন তুললে হবে না। প্রশ্ন তুলতে হবে সকল অপরাধের ও অপরাধীর উত্স নিয়ে। অন্যথায় আমরা কিছুদিন পর পর একজন রিফাত খুন ও একজন নয়ন খুনি হওয়া দেখব। অপরাধ ও অপরাধীর উত্স খুঁজে বের করে এর মূলোত্পাটন করা ছাড়া আমাদের মুক্তির কোনো উপায় নেই। আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
মৌলভীবাজার
