মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

'ইউক্রেন হেরে গেলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে'

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৫৫

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব রেখে উত্থাপিত একটি বিল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ভোটাভুটির আগে দিয়ে ঐ বিলটি অনুমোদন দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ডেনিস শামিহাল। তিনি বলেন, যদি যুদ্ধে ইউক্রেন হেরে যায়, তবে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ শুরু হয়ে যাবে। এদিকে ইইউ দেশগুলোকে ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী অস্ত্র পাঠাতে হবে বলে জানিয়েছেন ইইউর পররাষ্ট্র নীতির প্রধান জোসেপ বোরেল। অন্যদিকে ইউক্রেনের চেরনিগিভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।

জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন প্রস্তাবিত ইউক্রেনের সাহায্যসংক্রান্ত বিলটি দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসে আটকে আছে। যেখানে কিয়েভের জন্য ৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের কথা বলা হয়েছে। শনিবার ঐ বিলের ওপর পুনরায় ভোটাভুটি হবে। বিলে কিয়েভের পাশপাশি ইসরাইল ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহায়তার প্রস্তাবও রয়েছে। বুধবার ওয়াশিংটন ডিসিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় শামিহাল বলেন, ‘আগামীকাল নয়, আজ নয়, বরং গতকালই আমাদের ঐ অর্থের প্রয়োজন ছিল। যদি আমরা প্রতিরক্ষা না করি ইউক্রেনের পতন হবে। আর তাতে বিশ্ব ও বৈশ্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পুরো বিশ্বে নিরাপত্তার একটি নতুন ব্যবস্থা খুঁজে বের করার প্রয়োজন পড়বে। অথবা সেখানে অনেক সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে, অনেক ধরনের যুদ্ধ এবং দিন শেষ ঐ সব যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিজেদের সম্ভাব্য পরাজয়ের ফলাফল কী হতে পারে, তা নিয়ে ইউক্রেন অবশ্য এবারই প্রথম বিশ্বকে সতর্ক করছে না। গত বছর দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, যদি রাশিয়া যুদ্ধে জিতে যায়, তবে তারা এরপর পোল্যান্ডে আক্রমণ করবে। যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে উসকে দেবে। তবে ইউক্রেনের নেতাদের এসব সতর্কবার্তা উড়িয়ে দিয়ে ক্রেমলিনের কর্মকর্তারা বলেছেন, পশ্চিমারা এসব বলে ভীতি ছড়াচ্ছে। গত মাসেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার দেশ পূর্ব ইউরোপে আক্রমণ করবে বলে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে তা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, এগুলো ‘সম্পূর্ণ বাজে কথা’। রাশিয়া কখনো ন্যাটো জোটভুক্ত দেশে আক্রমণ করবে না। ন্যাটো সংবিধান অনুযায়ী, সদস্যভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হওয়ার অর্থ ন্যাটোকেই আক্রমণ করা এবং পশ্চিমা এ সামরিক জোট তখন পূর্ণ শক্তি দিয়ে ঐ আক্রামণ প্রতিহত করবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইউক্রেনকে সহায়তা বিল মূলত আটকে যাচ্ছে রিপাবলিকান দলের ডানপন্থি আইনপ্রণেতাদের কারণে। তাদের বেশ কয়েক জন তাদের আপত্তির কারণ ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিদেশে সহায়তা হিসেবে লাখ লাখ ডলার না পাঠিয়ে বরং আগে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তহবিল পাঠানো উচিত। বুধবার এক বিবৃতি এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, কংগ্রেসে পাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঐ সহায়তা প্যাকেজে অনুমোদন দিতে সই করবেন। যাতে আমরা বিশ্বকে এই বার্তা দিতে পারি যে, আমরা আমাদের মিত্রদের পাশে আছি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের অস্ত্র সরবরাহের ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। কংগ্রেসে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বিলটি কয়েক মাস ধরে আটকে থাকার প্রভাব এরই মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে পড়তে শুরু করেছে। কিয়েভ জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধাস্ত্র দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

এদিকে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে অবশ্যই দেশটিতে ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বসংসী অস্ত্র পাঠাতে হবে বলে জানিয়েছেন ইইউর পররাষ্ট্র নীতির প্রধান জোসেপ বোরেল। কেননা, ইউক্রেনীয় শহরগুলো হামলা আরো জোরদার করেছে রুশ বাহিনী। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক এই কথা বলেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, ইউক্রেনকে সাহায্য করার জন্য ইউরোপ শুধুই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ইউক্রেনে রুশ বাহিনী সর্বাত্মক হামলা চালানোর পর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এর মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই গোলাবারুদের ব্যাপক ঘাটতির মুখে পড়েছে ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা কয়েক মাস ধরেই ইউক্রেনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতাবিষয়ক বিল আটকে রেখেছে। এদিকে সময়মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে ইইউ। ইতালির ক্যাপ্রি দ্বীপে গ্রুপ অব সেভেন (জি-৭)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠকে সাংবাদিকদের ইইউর পররাষ্ট্র নীতির প্রধান জোসেপ বোরেল বলেন, আমাদের দেশপ্রেম আছে, আমাদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী অস্ত্র আছে। সেগুলো আমাদের গুদাম থেকে বের করে এনে ইউক্রেনে পাঠাতে হবে, যেখানে যুদ্ধ চলছে। এমনটি না করলে ‘অন্যথায় ইউক্রেনের বিদ্যুত্ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে’ বলে সতর্ক করেন তিনি। বোরেল বলেন, ‘ঘরে, কারখানায়, অনলাইনে, সবকিছুর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্ না থাকলে কোনো দেশই লড়াই করতে পারবে না। ইতালিতে জড়ো হওয়া জি-সেভেনের মন্ত্রীদের মূল আলোচ্য বিষয়ের একটি ছিল ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। বুধবার ইউক্রেনকে সাহায্য করার জন্য জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর কাছে আবেদন করার পরই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউক্রেনে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের বিষয়ে বোরেল বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত, আমরা এটি করবই। তবে আমাদের তা শিগিগরই করতে হবে।’ এ সময় আফসোস করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অভ্যন্তরীণ রাজনীতি’র কারণে ইউক্রেনের জন্য প্রস্তাবিত ৬ হাজার ৮৪ কোটি ডলার মূল্যের একটি অত্যন্ত জরুরি সহায়তা প্যাকেজ আটকে আছে। তিনি বলেন, আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারি না। আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্ব নিতে হবে এবং ‘আরে! এটা তো যুক্তরাষ্ট্রই করবে’ বলা বন্ধ করতে হবে।

এদিকে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলের শহর চেরনিগিভের সিটি সেন্টারে বুধবার রাশিয়ার তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ হয়েছে। আহত হয়েছেন আরো ৭৮ জন। বৃহস্পতিবার নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার খবর দেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটাই ইউক্রেনে রাশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। যা ইউক্রেন সরকারের মিত্র দেশগুলোর কাছে আকাশ সুরক্ষা সহায়তা বৃদ্ধির আবেদনকে আরো জোরাল করল। রাশিয়ার হামলার পর বৃহস্পতিবার সকালে চেরনিহিভের সিটি সেন্টারে উদ্ধারকাজ সম্পন্ন হয় বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে এক পোস্টে জানান, গভর্নর ভিয়াচেস্লাভ চাউস। ইউক্রেনের চেরনিগিভে বুধবার রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিহত এক জনের মৃতদেহ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে বরাবরের মতো রাশিয়া বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে।

ইত্তেফাক/এসটিএম