মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বাতাসে আগুনের হল্কা

  • হিটস্ট্রোকে তিন জনের মৃত্যু, 
  • ঢাকায় ৪০ ডিগ্রি অতিক্রম
  • যশোরে প্রায় ৪৩ ডিগ্রি
আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:০০

ভয়াবহ তাপদাহে রাজধানীসহ প্রায় গোটা দেশই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাতাসে যেন আগুনের হলকা। বহু জেলায় অনুভূত হচ্ছে রীতিমতো মরুর উষ্ণতা। বাতাসে আর্দ্রতার আধিক্যে নাভিশ্বাস ওঠার দশা। প্রচণ্ড গরমে-ঘামে হাঁপাচ্ছে মানুষ। হাঁসফাঁস অবস্থা প্রাণিকুলের। সড়কের পিচ পর্যন্ত গলে যাচ্ছে। আক্ষরিক অর্থেই কাঠফাটা গরম। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তরাঞ্চলসহ অস্বাভাবিক হিট ওয়েভ বিস্তৃত হয়েছে সব বিভাগে। প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে এই তাপদাহ।

হিট অ্যালার্ট জারির প্রথম দিনেই গতকাল চুয়াডাঙ্গা ও পাবনায় হিট স্ট্রোকে মারা গেছে তিন জন। ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ১২ জেলায় বইছে অতি তীব্র তাপদাহ। দেশের ইতিহাসে এত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে তাপমাত্রার রেকর্ড নেই। যশোরে চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চুয়াডাঙ্গায় ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল ঢাকায় তাপমাত্রা ওঠে ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত বছর ১৫ এপ্রিল ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রিতে। ১৯৬৫ সালে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

প্রভাতে সূর্যের তাপ একটু সহনীয় থাকলেও বেলা বৃদ্ধির সঙ্গে তাপের তীব্র তেজ আর উষ্ণতা অগ্নিবান ছড়াচ্ছে। অতি তীব্র তাপপ্রবাহে জনশূন্য হয়ে পড়ছে শহর-বন্দর-মফস্বলের রাস্তাঘাট। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না কেউই। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক সপ্তাহ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতিদিন বাড়ছে উষ্ণতা। কবে কমবে এই দাবদাহ, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে আবহাওয়া মডেলগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ১০ দিনেও কমবে না দাবদাহ। সামান্য কমবে আবার বাড়বে। কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ ছাড়া অন্য সাতটি বিভাগ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ অতিক্রমের প্রবল আশঙ্কা করা যাচ্ছে। রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় প্রতিদিনই ৪০ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠার আশঙ্কা করা যাচ্ছে। এই সপ্তাহে খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা বিভাগের বেশির ভাগ জেলায় গত ৫০ বছরের দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভঙ্গ করার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানা রোগবালাই। বিশেষ করে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে। শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে বেড়েছে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের রোগীর সংখ্যা। মাত্রাতিরিক্ত গরমে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। সেই সঙ্গে শিশু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। আম, লিচুর গুটি, কাঁঠালের মোচা শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে। মাঠের ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। পানি তপ্ত হয়ে দক্ষিণাঞ্চলে ঘেরের মাছ মরে যাচ্ছে।

দুই জেলায় হিট স্ট্রোকে তিন জনের মৃত্যু

হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গতকাল পাবনা ও চুয়াডাঙ্গায় তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। পাবনায় হিট স্ট্রোকে মারা গেছেন সুকুমার দাস (৬০)। তিনি পাবনা শহরের শালগাড়িয়া জাকিরের মোড়ের বাসিন্দা। এদিকে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় মাঠে কাজ করার সময় হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে জাকির হোসেন নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তিনি দর্শনা থানার সীমান্তসংলগ্ন ঠাকুরপুর গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে ও ঠাকুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি। এছাড়া চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় হিট স্ট্রোকে মর্জিনা খাতুন (৬০) নামে এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব কমলেও গত বছরের মতো এবারও তাপপ্রবাহ দীর্ঘ হবে। তীব্র তাপমাত্রার কারণে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে, তেমনি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও সংকট দেখা দেবে। তারা বলছেন, এপ্রিল বছরের উষ্ণতম মাস। এছাড়া এল নিনোর প্রভাব রয়েছে। আবহাওয়ার এ বিশেষ অবস্থা জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। চলতি মাসে কয়েকটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহের শঙ্কা রয়েছে। এ মাসে বৃষ্টিপাতও স্বল্প হবে। মাস জুড়ে গরমের আধিক্য থাকবে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বড় ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও রয়েছে। এর ফলে দেশে তাপপ্রবাহের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।

তাপমাত্রার এমন পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, আমাদের দেশে ৭১ শতাংশ বৃষ্টি হয় বর্ষাকালে। স্বাভাবিকভাবে জুনের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে বর্ষা সেট হয়। এ সময় টানা বৃষ্টি হতো। কিন্তু এখন লক্ষ করলে দেখা যায়, টানা বৃষ্টি নেই। কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টি বা এক দিন বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বর্ষার যে ধরন, সেটা পরিবর্তন হচ্ছে। বর্ষা আসছে দেরিতে, যাচ্ছেও দেরিতে। অনেক সময় দেখা যায়, অস্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে। আবার যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা তখন না হয়ে অন্য সময় বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। গত বছরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে জুলাইয়ে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু গত বছর জুলাইয়ে বৃষ্টি কম হয়েছে। আবার আগস্টে দেখা গেছে প্রচুর বৃষ্টিপাত। দীর্ঘ সময় আর্দ্রতা বেশি থাকছে। ফলে মানুষের গরমের যে অনুভব সেটা বেড়ে যাচ্ছে। ১০-১২ বছর ধরে এ সমস্যা হচ্ছে। বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রথমত বৈশ্বিক উষ্ণতা, আবার নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এর একটি বড় প্রভাব রয়েছে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার পেছনে। 

এদিকে সারা দেশে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও গরম অনুভূত হওয়ার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বায়ুদূষণও অন্যতম দায়ী বলে মনে করেন বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বলেন, ধূলিকণা এবং দূষিত গ্যাসের তাপ শোষণ করার ক্ষমতা থাকার কারণে বর্তমানে অত্যধিক দূষিত ধূলিকণা এবং গ্যাসীয় পদার্থগুলো সূর্যের তাপমাত্রাকে শোষণ করে তাপপ্রবাহ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। মানে অক্সিজেনকে সরিয়ে অন্য দূষণ জায়গা করে নিচ্ছে। অক্সিজেন কমে যাওয়া মানে শীতলতা কমে যাওয়া। এটা হলো সরাসরি প্রভাব। দ্বিতীয় বাতাসের মধ্যে যখন অন্যান্য দূষণ আসে, সেই দূষণগুলোর কতগুলো ওয়ার্মিং বৈশিষ্ট্য থাকে। বাতাসে যদি কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যায়, এটা তখন উষ্ণতা তৈরি করে। তারপর মিথেন কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে ৮০ বেশি উষ্ণতা তৈরি করতে পারে। তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে দেশ কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান বলেন, আমরা কিন্তু এখনই ভবিষ্যতের একটা ডেমো দেখতে পাচ্ছি। মরুকরণের প্রাথমিক একটি লক্ষণ। 

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, ৩০ বছর আগেও আমাদের দেশের চাষাবাদে সেচ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তাপপ্রবাহ, তীব্র খরা এবং স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না থাকায় এখন সেচনির্ভর চাষাবাদ হচ্ছে। খরার কারণে দেশের উত্তরের জেলাগুলো ধানচাষ বাদ দিয়ে আমের বাগান করছে। এভাবে যদি খরা বাড়তে থাকে, দেখা যাবে যে আমবাগানও থাকবে না। আবার দক্ষিণের জেলাগুলোতে খরার ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সেখানে চাষাবাদ কমে যাচ্ছে। তার মানে খরার ফলে একেক অঞ্চলে একেক ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন