রাফিদুল রাফি
ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে মেসে ওঠার পর আমার প্রথম রুমমেট হয়েছিলেন বাদল ভাই। বয়সে তিনি আমার থেকে ছয়-সাত বছরের বড়, তবে ক্লাসের হিসাবে মাত্র তিন বছরের সিনিয়র। তিনি বেশ অমায়িক কিন্তু আলসে টাইপের মানুষ। তাঁর সম্পর্কে এর বেশি কিছু তখন আর জানতাম না।
তবে তাঁর নাম নিয়ে অল্প একটু জানতাম! কথিত আছে, শ্রাবণ মাসের এক তুমুল বৃষ্টির রাতে বাদল ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল বলে দাদি নাম রেখেছিল বাদল। তবে তিনি বর্ষাকাল ও বৃষ্টি কোনোটাই পছন্দ করতেন না। এমনিতে তিনি শুচিবাইয়ের রোগী, বৃষ্টি দেখলেই তাঁর নাকি খালি গা চুলকায়। এদিকে আমার আবার প্রিয় ঋতু বর্ষা। বৃষ্টি এলেই জানালা খুলে দিই, বৃষ্টিতে ভিজি, বৃষ্টির গান শুনি। তিনি বৃষ্টি পরবর্তী স্যাঁতসেঁতে রুম এবং ভেজা রাস্তাঘাট সহ্য করতে পারতেন না। বৃষ্টির গানও পছন্দ করতেন না।
তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে নামঘটিত নানা বিড়ম্বনা দেখেছি। নিজের নাম নিয়েও তিনি খুব বিরক্ত। মানুষের নাম বাদল কেন হবে, এই হিসাব তিনি মেলাতে পারেন না। কারোর নাম বৃষ্টি, বর্ষা, মেঘ, শ্রাবণ ইত্যাদি হলেও তিনি তাকে এড়িয়ে যান।
একবার হয়েছে কী, আমাদের বাদল ভাই ভার্সিটিতে আমার ব্যাচের এক মেয়েকে পছন্দ করে বসলেন। মেয়েটির নামধাম ডিপার্টমেন্ট কিছুই জানেন না তিনি। আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল যেন মেয়েটির নামধাম জেনে দিই। ব্যস কাজে নেমে গেলাম। কাজ হয়েও গেল। মেয়ের নাম ‘বর্ষা’ শুনে তিনি বেডে শোয়া অবস্থা থেকে লাফিয়ে বসলেন।
বললেন, ‘ও বাদ, এই মেয়ে বাদ, একটা মেয়ের নাম বর্ষা কেন হবে? আমি বর্ষাকাল নিতে পারি না। আমার গা চুলকায়!’
কী আর করা, বর্ষা মেয়েটিকে বাদল ভাই আর তার মনের কথা বললেন না।
এরপর কেটে গেল ১ বছর।
ভার্সিটিতে নতুন আরেকটা ব্যাচ এল। আবারও এক মেয়েকে ভালো লেগে গেল বাদল ভাইয়ের। যথারীতি আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল এই মেয়ের নাম আর ডিপার্টমেন্ট খুঁজে বের করার। এই মেয়ের নাম মেঘলা।
বাদল ভাই এই নাম শোনার পর বললেন, ‘এইটা চলে, শুধু মেঘলা, বৃষ্টির কোনো কারবার নাই। চালিয়ে নেব। আমার একটা প্রেম করাই লাগবে!’
এরপর একদিন দেখলাম বাদল ভাই আর মেয়েটি ভার্সিটির একটা ফুচকার দোকানে বসে জমিয়ে ফুচকা খাচ্ছেন। তাঁদের দেখে আমার বেশ ভালোও লাগল।
মাস খানেক বেশ ভালোই কাটল দুজনের। এরপর হঠাত্ মেয়েটি ভাইকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলল। ভাই মন খারাপ করে থাকলেন দু-একদিন। এরপর আমাকে ডেকে বললেন, ‘বুঝলি, যে মেয়ে বৃষ্টি পড়লেই দৌড়ে ভিজতে চলে যায়, তার সাথে আমি প্রেম করতে পারব না, বিয়ে তো দূরের আলাপ! উই জাস্ট ওয়ার গুড ফ্রেন্ডস, আর কিচ্ছু না।’
‘কী বলেন ভাই, তার মানে আপনারা রিলেশনে যাননি?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
ভাই বললেন, ‘না, সে বৃষ্টি পছন্দ করে। তার এ পছন্দ শুনে প্রপোজই করিনি। মাঝখানে শুধু শুধু কতগুলা টাকা নষ্ট করলাম ফুচকা খাওয়াইয়া। ফুচকার মরিচ কোথাকার!’
বাদল ভাই অনার্স শেষ করে মেস ছেড়ে চলে গেছেন মাসখানিক হলো। একদিন ফোন দিয়ে বললেন, ‘আমার চাকরি হইছেরে। এদিকে দাদি অসুস্থ, সে নাতবৌ দেখে মরতে চায়। বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। পাত্রিও দেখতে যাচ্ছি শীঘ্রই। শর্টকার্ট প্রোগ্রামে আপাতত বিয়ে করে ফেলব। বড় অনুষ্ঠান পরে হবে, দাওয়াত পাবি তখন।’
আমি বললাম, ‘বেশ তো ভাই, করে ফেলেন বিয়ে।’
সপ্তাহখানেক পর ফেসবুকে ঢুকে দেখি বাদল ভাই ‘গট ম্যারিড’ পোস্ট দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রীকে ট্যাগ দেননি। অনেকেই অভিনন্দন জানাচ্ছেন, আমিও জানালাম।
এই ঘটনার কিছুদিন পরের ঘটনা। সকাল থেকে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। ক্লাসে যাইনি বৃষ্টির জন্য। শুয়ে শুয়ে বৃষ্টির গান শুনে অলস সময় কাটছে। ফেবুতে বৃষ্টি নিয়ে নানারকম স্ট্যাটাস দেখছি আর নিউজ ফিড ঘাটছি। এর মধ্যে চোখে পড়ল বাদল ভাইয়ের আইডি থেকে একটি ছবি আপলোড করা হয়েছে। বাসার ছাদে বাদল ভাই আর একটি মেয়ে ভিজছে। ক্যাপশনে লেখা ‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না’।
মেয়েটি যে বাদল ভাইয়ের বউ, তা আর বুঝতে বাকি রইল না। কিন্তু একি? কোথায় গেল বাদল ভাইয়ের বৃষ্টিবিদ্বেষ? কোথায় তার শুচিবাই! কিভাবে এমন হলো? ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম!
ঘুম থেকে উঠে দেখি রাত হয়ে গেছে। এবার ফেবুতে ঢুকে দেখি, বাদল ভাই স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি। আমায় আর কান্নার ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই!’
ব্যাপার কী বুঝতে কমেন্ট করলাম, ‘বাহ্ ভাই! সেই অবস্থা আপনার! বিকালে বৃষ্টিতে ভিজলেন, আর এখন বৃষ্টির গানও শুনছেন! আপনি না বৃষ্টিকে সহ্যই করতে পারেন না। চুলকায় আপনার! এখন এসব কী?’
কমেন্ট করে দেখি আমার কমেন্ট আধা মিনিটের মধ্যে গায়েব। এরপর আমার আইডিকে ব্লক মেরে দিয়েছে বাদল ভাই।
আমি বাদল ভাইয়ের ওপর বিরাট রাগ করে ফেসবুক থেকে বের হয়েছি মাত্র এমন সময় বাদল ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বলল, ‘কী কমেন্ট করিস এসব? বলদা, তোর ভাবির নাম বৃষ্টি। ও রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেছে একটু আগে। ওর অ্যাটেনশন পেতে ওরে নিয়ে স্ট্যাটাস দিছি। আমার পাসওয়ার্ড ও জানে। তোরে সে ব্লক দিছে। ঝামেলার মধ্যে আরো বেশি ঝামেলায় ফেললি। সে ভাবতাছে, আমি বৃষ্টি মানে তারে আমি সহ্য করতে পারি না। তোর এমন কমেন্ট করা লাগে কেন? বলদা বলদা বলদা!’ বলতে বলতে ফোন কেটে দিলেন বাদল ভাই।
বাদল ভাইয়ের বৃষ্টি বিড়ম্বনায় আমিও আজ বিড়ম্বিত! তবে বাদল ভাই বৃষ্টি নামের মেয়েকে কিভাবে বিয়ে করলেন, এ হিসাব মিলাতে পারি না।
এদিকে আমার কপালে তো ব্লক জুটল। কে জানে বাদল ভাইয়ের কপালে কী আছে!
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়,
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।
