সৈয়দা ইয়াসমিন আরা
আমি আর পলি—দুই বান্ধবী। দুজনের মধ্যে একেবারে অন্তর-আত্মার টান, যেমনটা হয় দুই বোনে বোনে। তো যা কিছুই রান্না হোক, একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করবেই। এই যেমন পলির রান্না করা মাছ আমার খুব প্রিয়। পলি মাছ রান্না করলে এক বাটি চালান হবেই আমার কাছে। তেমনি আমার হাতের প্রিয় কিছু রান্না পলির কাছে যাবেই। এমন খাবার চালাচালির ভেতর ঘটে গেল সেই বিখ্যাত ঘটনা।
আমার দেশের বাড়ি বগুড়া। বগুড়ার একটি বিশেষ রান্না আলুর ঘণ্ট, যাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলে ‘আলুর ঘাটি’। এই আলুর ঘাটি পলির খুব প্রিয়। এক সন্ধ্যায় আমি আলুর ঘাটি রান্না করে পলির ঘরের উদ্দেশে যাওয়ার জন্য যেই না দরজা খুলেছি, অমনি এক স্প্যানিশ যুবক (আগে থেকেই হয়তো দরজায় ওঁত পেতে ছিল) আমাকে ধাক্কা মেরে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। বেকুব বেটা জানে না, আমি শুধু জিনভূত ডরাই, মানুষরূপী ভয়ংকর পিশাচকে না। এদের প্রতিহত করার মনের জোর নিয়েই আমি চলি। যুবকটির ধাক্কা খেয়ে এক মুহূর্তের ভেতর বুঝে ফেলেছি কী ভয়ানক ঘটনা ঘটতে চলেছে। মনে মনে আল্লাহকে ভরসা করে আমার কেরামতি দেখানো শুরু করলাম স্প্যানিশ ছোকরার ওপর। আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া, এক্কেবারে খাস বাংলায় গালিগালাজ। যেকোনো মানুষ এরকম বিশেষ মুহূর্তে মাতৃভাষার গালির প্রতি ভীষণ টান অনুভব করে। আমিও তাই করলাম, ‘ওই ওই করোস কী! মাগো! বাবাগো! অমুকের বাচ্চা! তমুকের বাচ্চা! ওই হারামি তুই কেএএএ?’ এরপর আমিও গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওই বেটাকে দিলাম পাল্টা ধাক্কা। ওই বেটা হয়তো ভেবেছিল, অবলা নারী এক ধাক্কাতেই কাত্ হয়ে যাবে, তারপর পৈশাচিকতার নমুনা পেশ করবে। তাই নাকি রে? এমন আহ্লাদি আশা নিয়ে এসেছ? তোর এই আশার ওপর আজ আমি আলুর ঘাটি ঢালব রে বাছাধন। এরপর মৃত্যু পর্যন্ত শিউরে শিউরে উঠবি আমাকে স্মরণ করে। যুবকটি আমার আচমকা ধাক্কা সামলাতে না পেরে পেছনে টালমাটাল হতে হতে আমি ঝেড়ে দিলাম এক লাথি। ব্যস, ছোকরা ধপাস করে ফ্লোরে যেই না বসে পড়েছে, অমনি সদ্য চুলা থেকে নামানো টাটকা গরম আলুর ঘাটি বেটার মুখ বরাবর ছুঁড়ে পরিবেশন করলাম। নে, এবার গরম গরম আলুর ঘাটি খা।
এর পর পরই দরজা বন্ধ করে ৯১১ নম্বরে কল দিলাম। বন্ধ দরজায় তখন ভীষণ ধুমধাম বাড়ি আর ধাক্কা চলছে। কারণ, মহাশয় একা অতিথি হয়ে আমার বাড়িতে আলুর ঘাটি খেতে আসেনি, সঙ্গে ছিল আরেকজন। তিনি নাকি লিফটের কাছে পাহারা দিচ্ছিলেন। দুজনের কাছেই পিস্তল ছিল। এসব আমি পরে পুলিশের কাছে জেনেছি। যা হোক, ৯১১ নম্বরে কল করার পর আমি যখন হরহর করে তাদের ঘটনা বলে সাহায্যর আবেদন করছি, তারাও শুনতে পাচ্ছিল দরজায় ভীষণভাবে করাঘাতের শব্দ। খুব বেশি না, ১০ মিনিটও যায়নি, দরজার ওপাশ থেকে পুলিশের কণ্ঠ পেলাম, ‘ম্যাম, চিন্তার কিছু নেই। তুমি নিশ্চিন্তে দরজা খুলতে পার। আমরা পুলিশ।’ দ্বিধায় পড়ে গেলাম, এত তাড়াতাড়ি পুলিশ আসবে কোথা থেকে? ৯১১ ওয়ালাদের পুুুুনরায় পুলিশের উপস্থিতির কথা জানালাম। তারাও বলল, ‘অসুবিধা নেই। তুমি নিশ্চিন্তে দরজা খুলতে পার। তারা সত্যিই পুলিশ, তোমাকে সাহায্য করতে এসেছে।’ দরজা খোলার পর যে দৃশ্য দেখলাম, একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। একটা না, দুটো বলদ সেখানে ত্রাহি চিত্কার করছে। একটা গরম আলুর ঘাটিতে ঝলসানো পোড়া মুখ ঊর্ধ্বমুখী করে গ্যাঁ গ্যাঁ ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করছে। অন্যজনকে পুলিশ পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে উপুড় করে শুইয়ে রেখে তার ওপর সোয়ারি হয়ে পিস্তল তাক করে বসে আছে। এমন দৃশ্য দেখে আমি বেশ মজা পেয়ে বলে উঠলাম, ‘ওয়াও!’ আরো ২-৩ জন ছেলেমেয়ে ওদের ঘিরে আছে। তারা সবাই সিভিল পোশাকে পুলিশ। মুহূর্তে ধুপধাপ আওয়াজে সিঁড়ি বেয়ে কম করেও ৮-১০ পুলিশ এসে হাজির। যার ওপর পুলিশ সোয়ার হয়েছিল, আমি ঘর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অশ্রাব্য ভাষায় গালি আর অগ্নিঝরা দুই চোখে তার সে কী ঘৃণা! পুলিশ আমাকে দুজনের মুখ দর্শন করিয়ে বলল, ‘তুমি এবার তোমার ঘরে প্রবেশ করো। আমরা এদের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে চললাম।’ পুলিশদের ধন্যবাদ দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
দুদিন পর আমার ফোনে কোর্ট থেকে কল এল। আমার পক্ষ হয়ে পুলিশ সেই দুজনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছিল। কোর্ট থেকে সরকারি যে উকিল আমার পক্ষ হয়ে লড়বে, সে আমার সহযোগিতা চেয়েছিল। আমার সাফ জবাব ছিল, ‘আমি কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করতে পারব না, এত সময় আমার নেই। তোমাদের যা মনে চায়, তাই করো তাদের নিয়ে।’ অবশ্য শেষে একটু মিচকা দুষ্টামি করতে ছাড়লাম না। বললাম, ‘ওদের এমন জরিমানা করো, যাতে সারাজীবন জরিমানা শোধ করতে করতে ফক্কিন্নি হয়ে যায়। যার মুখ বেগুনপোড়ার রূপ দিয়েছি, সে যেন ইহকালে কসমেটিক সার্জারি করে আর চাঁদবদন হতে না পারে।’ আমার কথা শুনে উকিলের হাঃ হাঃ করে সে কী হাসি! বলল, ‘তুমি তো খুব ফানি!’ এক সপ্তাহ পরে আমার ঠিকানায় কোর্ট থেকে নোটিস এল, তাদের সাজা হয়েছে এবং আগামী এক বছর আমি পুলিশ প্রটেকশনে থাকব। যেন তারা বা তাদের কোনো সঙ্গী আমার কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
আমি মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, আমাদের দেশের মেয়েরা যদি এমন সাহস বুকে ধারণ করে চলত, তবে এরকম অযাচিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কত সহজ হতো। আরে তুমি মেয়ে আর ওরা ছেলে। আল্লাহ দুজনকে সমান বুদ্ধি, বিবেক, হাত-পা দিয়েছেন। মেয়েদের গায়ের জোর কম হলেও বুদ্ধির জোর তো আছে। কেন আমি পারব না? আমি বেচারি, আমি অবলা—এমন চিন্তা করে নিজেকে ধ্বংস করব? আল্লাহ আমার সঙ্গে আছেন, অন্যায় প্রতিহত করার জন্য তিনি সবসময় আমাকে সাহায্য করবেনই। এই বিশ্বাস নিয়ে চললে বাংলার মেয়েরা সাফল্য পাবেই। বুকে সাহস আর মাথায় বুদ্ধি থাকলে সামান্য আলুর ঘাটিই অনেক বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে। হিঃ হিঃ হিঃ!
জ্যামাইকা, নিউইয়র্ক, আমেরিকা।
