বাসার তাসাউফ
‘লেখাপড়া শেষ করেছিস। চাকরিও করছিস একটা। এবার বিয়ে...!’ কয়েকদিন ধরে বাবা ও মা এভাবেই আমার বিয়ের জন্য বলে যাচ্ছে। আমি মুখে কিছু বলিনি। ‘মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ’ ভেবে নিয়ে তারা পাত্রীর সন্ধানে নেমে পড়েছে। দশটির মতো মেয়ে দেখেও ফেলেছে। কিন্তু কাউকেই পছন্দ হয়নি। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে বাবা আমাকে বলে বসল, ‘এ যুগের ছেলে তুই, একটা প্রেম-ট্রেমও যদি করে রাখতি আমরা হাসিমুখে তাকেই বউ করে ঘরে আনতাম।’
তখন আমার মনে পড়েছিল খাদিজার কথা। সেই যে প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় যার সঙ্গে চড়ুইভাতি খেলতে গিয়ে বউ বউ খেলেছি। সে এখন কাতার প্রবাসী এক পয়সাওয়ালা যুবকের বউ। সুতরাং তার কথা মনে করেও আর লাভ নেই। কলেজে পড়ার সময় নীলার সঙ্গে একবার বন্ধুত্ব হয়েছিল। কিন্তু তা প্রেমে রূপান্তরিত হয়নি। সেদিন বড় ভাবি এসে জানতে চাইল আমার পছন্দের কোনো মেয়ে আছে কি না। আমার কাছ থেকে না-বোধক জবাব পেয়ে পারিবারের লোকজন ঘটকের শরণাপন্ন হলো। ঘটকের নাম আউয়াল মিয়া। আমাদের পাশের গ্রামের অদুদ মিয়ার ছেলে। বিমার দালালের চেয়ে বেশি অধ্যবসায়ী সে। এরমধ্যে সাত-আটখানা মেয়ের ছবি দেখিয়ে তাদের সাত-পুরুষের ইতিবৃত্ত শুনিয়ে গেছে। কিন্তু কোনোটাই পছন্দ হয়নি। কিন্তু নাছোড়বান্দা আউয়াল মিয়া। ফটোর নতুন চালান নিয়ে, নোট খাতা ভর্তি এক গাদা জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে দুদিন না যেতেই। টিভি, মোটর সাইকেল, থানা সদরে পাঁচকাঠা জমি কিংবা ঘর সাজানোর আসবাব দেওয়ার কথা বলে একটার পর একটা টোপ ফেলেছে। আমি তো হাবাগোবা বেলে মাছ নই যে, কেঁচো মোড়ানো বড়শিটি খপ করে গিলে ফেলব পরখ করে না দেখেই। তাকে বলেছি, ‘ওসব টাকা-পয়সা বাড়ি গাড়িতে আমার লোভ নেই, একজন শিক্ষিতা, সুরুচিপূর্ণ, অঝগড়াটে, অদেমাগি মেয়ে দেখুন আমার জন্য। অপ্সরী-টপ্সরী দরকার নেই, সাধারণের মধ্যে বৈশিষ্ট্য এমন হলেই হবে।’
‘আইচ্ছা, ব্যবস্থা করতেছি।’ বলেই আউয়াল মিয়া চলে গেল। দুই দিন পর এক কাকডাকা ভোরে সে আবার ফিরে এল। আমি ঘুম থেকে জেগে তখন বারান্দায় বসেছিলাম। সে এসে তেলতেলে হাসি হেসে বলল, ‘তোমার জন্য একটা পাত্রীর খোঁজ পাওয়া গেছে, একজাক্টলি তুমি যেমনটি চাও ঠিক তেমনই।’
‘দেখতে কেমন?’
‘গায়ের রং উজ্জ্বল গোলাপি।’
‘তার দুটো গুণের কথা বলুন।’
খাতা খুলে জীবনবৃত্তান্ত দেখে আউয়াল মিয়া বলে, ‘আছে, আছে। অনেক গুণ আছে। গুণে গুণে একবারে টইটম্বুর।
‘যেকোনো একটি গুণের কথা বলুন শুনি।’
‘আচ্ছা বলছি, তুমি এটাকে গুণ না বলে সুঅভ্যাসও বলতে পার।’
‘কী সেটা?’ ‘
‘রান্না।’
‘কী কী রান্না জানে?’
‘পোলাও, কোর্মা, চপ, পুডিং, কেক, নিমকি, পরাটা...!’
‘শুধু ওসবই। মাছ-মাংস, আলুভাজি অথবা ভর্তাটর্তা বানাতে পারে তো?’
‘পারে, পারে। আলুভাজি, উচ্ছেভাজি, ভর্তা, কইমাছের ঝোল, বেলে মাছের চচ্চরি...!’
‘ব্যস, ব্যস। ওতেই হবে।’ আমি মনে মনে হিসাব মিলাই। ছোটবেলা থেকেই আমার শখ মাছ ধরা। জাল দিয়ে, বড়শি ফেলে, চাঁই পেতে, পানি সেচে মাছ ধরার সবগুলো কায়দা আমার রপ্ত। এজন্য আমার মরহুমা দাদি আদর করে ডাকত, ‘নাতি আমার মেছুয়া। বড় হলে একটা কৈবর্তের মেয়ে আনব বউ করে।’
এখন দেখছি দাদির ইচ্ছেই পূরণ হতে চলেছে। আমি বড় বড় মাছ মেরে আনব আর বউ সেটা বিভিন্ন প্রণালিতে রান্না করে ভক্ষণ করাবে। আউয়াল মিয়া পাত্রীর ছবি দেখাল। ছবিটা বেশ। ছিপছিপে লম্বাটে গড়ন। উজ্জ্বল ডাগর চোখ! মোনালিসার মতো হাসি। আমার পছন্দ হয়ে গেল। এই খুশিতে আমি আউয়াল মিয়াকে খাওয়ালাম। খালি চা নয়, পুরো ব্রেকফাস্ট। খেতে খেতে সে জানতে চাইল, ‘তাহলে বাবা, পাত্রী তোমার পছন্দ হয়েছে? তোমার সম্মতি পেলে আমরা সামনে এগুতে পারি। বলো, তুমি কি এই মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি?’
আমি সম্মতি জানালাম, নীরবে মৌন সম্মতি নয়, একেবারে মুখ খুলে বললাম, ‘আমি রাজি।’
আমার সম্মতি পেয়ে পরিবারের মুরব্বিরা পাত্রীর বাড়িতে গেলেন। পাত্রীকে সরাসরি দেখে পাকা কথা বলে বিয়ের দিন ধার্য করতে যাবে, তখনই বাঁধল বিপত্তি। পাত্রীর নাম সুলতানা। সেও নাকি পাত্রকে দেখবে। পাত্রের বাড়িঘর দেখবে। এ যুগে পাত্রীর এমন ইচ্ছে হয়! মুরব্বিরা রীতিমতো রেগে আগুন হয়ে বাড়ি এসে আমাকে যখন এ কথা জানাল, তখন আমি বরফগলা জলের মতো শীতল গলায় বললাম, ‘পাত্রীর এই চাওয়াতে কোনো অন্যায় নেই। আসতে দিন তাকে।’
আমার কাছ থেকে সম্মতি পেয়ে পাত্রী সুলতানা তার বান্ধবীদের নিয়ে দলবেঁধে এসে হাজির হলো আমার বাড়িতে। তাদের সাত বান্ধবীকে দেখে আমার মায়ের চক্ষু যেন কপালে উঠে গেছে। ড্রয়িংরুমে বসে আমার জীবনবৃত্তান্ত জেনে চলে গেল। যাওয়ার আগে জানিয়ে গেল, ‘শুধু ছেলেরাই কেন মেয়েকে দেখতে যেতে পারবে? মেয়েরা কেন পারবে না? আমরা সেই প্রথা ভাঙতেই এখানে এসেছি। আর আপনাকে দেখার পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, আপনাকে আমি এখন বিয়ে করতে সম্মতি প্রকাশ করতে পারছি না...!’
তারপর...? তারপর আর কী? নটে গাছটি মুড়াল, বিয়ে আমার ফুরাল!
