সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
সে অনেক বছর আগের ঘটনা। তখন হিরুকে নিয়মিত ক্লাসে হাজিরা দিতে হতো। ক্লাসরুমে শিক্ষকের লেকচার ‘বিরক্তিকর’ মনে না হলেও, হিরু খুব করে যে গিলত, তা কিন্তু নয়। মফস্বলের স্কুল। শিক্ষার্থী কম। প্রত্যেক ছাত্রই স্যারদের মুখ পরিচিত। সুতরাং স্কুল কামাই দিলে রক্ষে নেই। সেই বয়সে হিরু নানা সমীকরণ মিলিয়ে একদিন স্কুল ফাঁকি দিয়েছিল।
সেদিনই বাবার কাছে নালিশ গেল, ‘হিরু স্কুল পালিয়েছে!’
বাবাও বাসায় ফিরে হাতে মোটা ডাণ্ডা নিয়ে হিরুকে পাকড়াও করলেন, ‘তুই স্কুল পালিয়েছিস?’
‘জে, আব্বা।’
‘কেন?’ গর্জে ওঠেন হিরুর বাপ।
‘সিনেমা দেখতে গেছিলাম।’
কথাটা বলার সময় হিরু ভাবছিল—এই বুঝি বিরাশি সিক্কার একটা চড় এসে পড়বে ওর গালে! কেননা, হাতে লাঠি থাকলেও বাপকে ও সেটাকে কখনো ব্যবহার করতে দেখেনি। কিন্তু না, এর কিছুই ঘটল না।
বাবা মুচকি হেসে বললেন, ‘সত্যিই সিনেমা দেখতে গিয়েছিলি?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু সিমেনা হলের টিকিট কালেক্টর মশাই তো বললেন, আজ তুই ওদিকে যাসনি!’
ভিজে বেড়ালের মতো চুপসে গেল হিরু। আজ ও স্কুল পলিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সিনেমা দেখার উদ্দেশ্যে নয়। এমনিই। স্কুল পালিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়িয়েছে।
বাবা ফের বললেন, ‘কাল স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে যাস। স্কুল পালিয়ে সিনেমা না দেখলে কী মজা! টিকিটের টাকা আমি কালেক্টর মশাইকে দিয়ে এসেছি!’
মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কোথায় স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখেছে বলে বাপের রাম-প্যাঁদানি খাবে, তা না। উল্টো কিনা বাপজানই ওকে সিনেমা হলের পথ দেখাচ্ছেন! এমন বাপও আছে!
পরদিন আবারও স্কুল পালাল হিরু। আবারও বাবা পাকড়াও করলেন ওকে।
‘আজও সিনেমা দেখতে যাসনি। কালেক্টর মশাই বলেছেন। প্রেম-ট্রেমও করিস না। তার মানে, কোনো মেয়ের পিছনেও মূল্যবান সময় ব্যয় করতে যাসনি।’
হিরু টাসকি খায়। এ কেমন বাপ!
স্কুলে সহপাঠীরা তাদের বাবাদের কঠিন অনুশাসনের গল্প করে। একটু লাইনচ্যুত হলেই নাকি বাবাদের রুদ্ররূপ দেখা যায়। কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকে হিরু বাবাকে একই রকম দেখে এসেছে। কখনো রাগ করেন না। রাগের নাটক করেন। হাতে লাঠিও থাকে। কিন্তু সেটা ব্যবহার করেন না। নাকি ব্যবহারবিধিও জানেন না! মাঝে মাঝে তো একটা চড়-থাপ্পরও মারতে পারেন! তাও না। হিরুর সন্দেহ হয় হয়, বাবার হাতে কি একটা চড় মারারও শক্তি নাই! স্রেফ একটা মশা মারার শক্তিও কি নেই ও হাতে? কিন্তু কুঠার হাতে গাছ কাটতে দেখে ওর সেই সন্দেহও দূর হয়।
মাস্টার মশাইকে বাবার কাছে নালিশ দেওয়ার ব্যাপারটা হিরুই শিখিয়ে দিয়েছে। প্রথমে তো তিনি রাজিই হননি। বলেছিলেন, ‘স্কুল পালাবে? বেশ পালাও না বাবা। সেজন্য নালিশ দেওয়ার কী আছে? আবার যখন স্কুল ভালো লাগবে, তখন এসে বসবে।’
হিরু তখন বাবার ব্যাপারটা স্যারকে খুলে বলেছিলেন। এত কষ্ট করে সমীকরণ মিলিয়ে স্কুল পালিয়েও কোনো লাভ হলো না। বাপজানকে বিন্দুমাত্র টলানো গেল না। বাপজান যে তাঁর ধরাবাঁধা সমীকরণেই রয়ে গেছেন!
দুই
সমীকরণ মেলানো আর না মেলানোর খেলায় হিরু আরো বেশি উত্সাহী হয়ে উঠল। ল্যাবে স্যার পানি ভেঙে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন উত্পন্ন করে, সেই অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন দিয়ে পানি তৈরির সমীকরণ শেখান। হিরু ওসব সমীকরণের ধার ধারে না। স্যার কাজ দিয়ে বাইরে যান। কখনো যান বাজার করতে, কখনো যান ক্ষেতে। হিরু খোঁজ নিয়ে জেনেছে, মাঝে মাঝে স্যার ওদের কাজ দিয়ে বাসায়ও যান। বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে রান্নাবান্নায় সাহায্য করেন! সহপাঠীরা বিজ্ঞানে ব্যাপক আগ্রহী। তারা এই উভয়মুখী সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষক এসে দেখেন, সবার আগে হিরু সমীকরণ মিলিয়ে বসে আছে। অর্থাত্ তিনি যে কাজটা করতে বলে গিয়েছিলেন, হিরু এরমধ্যে সেটা করে ফেলেছে! পানিকে ভেঙে অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন বানিয়ে, সেই দুটোকে মিলিয়ে আবার পানি বানিয়েছে! স্যার বাহবা দেন ওকে।
হিরু ইতস্তত বোধ করে। শেষমেশ বলেই ফেলে, ‘স্যার আমি তো কোনো কাজই করিনি। ভেবেছিলাম—এত ভাঙা-গড়ার কী আছে! আপনি তো ফল হিসেবে পানিই চেয়েছিলেন, পানিটাকে শুরু থেকেই একই রকম রেখে দিলেই হলো! পানি পানিই থাকল!’
শিক্ষক সোত্সাহে বললেন, ‘তুমি যে বিক্রিয়াটা বুঝেছ এটাই বড় কথা। আমরা হাতে-কলমে কেন শিখি জানো? যেন বিষয়টা আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি। আর তুমি কিনা উদাহরণ দেওয়ার আগেই ব্যাপারটা বুঝে গেছ! আসলে পৃথিবীতে এত এত পানি, অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন; এগুলো ভেঙে-গড়ে আমাদের কাজটাই বা কী!’
তিন
‘পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ সমীকরণ কোনটি?’
‘প্রেম।’
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সমীকরণ কোনটি?’
‘প্রেম।’
‘দুটোই প্রেম হয় কী করে?’
‘হয়রে পাগল হয়।’ হিরুর বাবা মুচকি হেসে বলেন ওকে। ‘তোর তো এ বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। সে কারণে আমার কথা তোর কাছে দুর্ভেদ্য ঠেকছে।’
হিরুর বাপ ভেবেছিলেন, খোঁচা খেয়ে পরদিন থেকেই হিরু প্রেম করার মিশনে নেমে পড়বে! কিন্তু কিসের কী। তার আর বুঝতে বাকি রইল না—তার কাছে সহজ আর কঠিন সমীকরণের কথা শুনে হিরু আর ও পথই মাড়াবে না। তিনি অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। অন্যের ছেলেমেয়েরা ধুমিয়ে প্রেম করছে, আর তার ছেলে কিনা...!
কিন্তু এদিকের ঘটনা বোধহয় তিনি জানেনই না!
হিরু যেই বালিকাকে মনে মনে পছন্দ করে, বালিকাই একদিন হিরুকে চিঠি ধরিয়ে দিল! হিরু ভাবনায় পড়ে গেল—কী করবে সে? সহজ নাকি কঠিন—কোন পথে এগোবে সে? এতদিন ভেবেছিল, মেয়েটিকে বললে সে বুঝি রাজি হবে না। তাকে রাজি করাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। অর্থাত্ কঠিন সমীকরণ! কিন্তু এখন যে দেখা যাচ্ছে—মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! অর্থাত্, সহজের থেকেও সহজ সমীকরণ! হিরু ফিরতি চিঠি লিখলেই প্রেম ‘ওকে’! একদিন নিয়ম মেনেই প্রেম পর্বের ইতি ঘটবে, আসবে দ্বিতীয় পর্ব—অর্থাত্ বিয়ের পালা। হিরু ভাবল—এত সহজ সমীকরণে গিয়ে কী লাভ! মেয়েটা তাকে ভালোবাসে। সেও যে তাকে ভালোবাসে মেয়েটা তো তা জানে না! ‘তাহলে ঘুরাই না কিছুদিন। প্রেম তো করবই একদিন!’ কঠিন সমীকরণ!
কিন্তু হিরু জানত না, প্রেমের ক্ষেত্রে সমীকরণ এক আজিব চিজ! মেয়েটা হিরুর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে চুপসে গেল। অন্যদিকে, আরেকজন ঢুকে পড়ল ওদের প্রেম কাহিনিতে। তার ক্রমাগত চিঠি পেয়ে অবুঝ বালিকাও গলে গেল! শুরু হয়ে গেল তাদের ‘সহজ সমীকরণ’ প্রেম! এদিকে হিরুর তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এভাবেও ছ্যাঁকা খাওয়া যায়! সে ঠিক করল, মেয়েটির চিঠির জবাব দিবে সে। সমীকরণ জটিল করে না তুললে কী মজা! তাছাড়া, প্রথম প্রেম বলে কথা! চিঠি পেয়ে বালিকাও ফাপড়ে পড়ে গেল। শত হলেও প্রথম প্রেম বলে কথা! কী করবে সে? প্রেম যে জটিল হয়ে ক্ষির! মেয়ের বাবার কান অবধি পৌঁছাতেও সময় লাগল না। হিরু ভেবেছিল, এই ওর বাবার কাছে নালিশ এল বলে! তারপর বাবা হাসিমুখে মেয়ের বাবাকে ওদের বিয়ের প্রস্তাব দেবেন! হিরু ওর বাবাকে ভালো করেই চেনে, তার সমীকরণ এমনই হওয়ার কথা।
কিন্তু না, মেয়ের বাবা বোধহয় এমন সমীকরণ আরো সহজভাবে মেলাতে ওস্তাদ। তিনি গোপনে বালিকাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিলেন! ত্রিভুজ প্রেম কাহিনিতে কোনো নায়কই বঞ্চিত হলো না। কষ্টটা দুজনই পেল—সমান সমান!
হিরু বুঝতে পারল, প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে কোনো সমীকরণই কাজ করে না।
চার
এরপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। হিরু এখন বিয়ে করে সংসার নামক সমীকরণ-এর প্যাঁচে আটকে আছে। অবশ্য এই প্যাঁচ ওর কাছে প্যারাময় নয়। কেননা, হিরুর গিন্নি কখনো-সখনো নাটক করে বটে, কিন্তু হিরুর জন্য সে সিরিয়াল সামলে চলা মোটেও মুশকিলের কোনো কাজ নয়।
বিশ্বকাপ নিয়ে পুরো দেশবাসী যখন সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত ছিল, তখন হিরু মনে মনে খুব হাসছিল!
ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের হারতে হবে, ইংল্যান্ডকে প্রথমে হারতে হবে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে, তারপর ভারতের সঙ্গে, তারপর... এভাবে সমীকরণে পর সমীকরণ এসে দাঁড়ায়। দেশবাসী বাংলাদেশকে সেমিফাইনালে তুলতে একের পর এক দলের পক্ষ নেয়। আর অবাক করা বিষয় হলো—শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ইংল্যান্ডের হার ব্যতীত আর কোনো সমীকরণই মেলেনি!
‘হিরু ভাই, তুমি বোধহয় বাংলাদেশকে সেমিতে দেখতে চাও না, তাই না?’
হিরু মুচকি হাসে। সেমিতে নিজের দেশকে কে না দেখতে চায়!
‘তুমি একটা লোক মাইরি। আমরা বাংলাদেশকে সেমিফাইনালে তুলতে হিমশিম খাচ্ছি। কোনো সমীকরণই মিলছে না। আর তুমি দিব্যি গোঁফে তা দিয়ে বেড়াচ্ছ!’
হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘কোনো সমীকরণে যাওয়ার কী দরকার? অস্ট্রেলিয়ার কি সমীকরণ মেলাতে হয়েছে?’
‘কী যে বলো না হিরু ভাই...’
‘সমীকরণ মেলানোর আগে দলের জয় চাই, বুঝলি। না জিতলে কোনো সমীকরণই কাজে আসবে না রে!’
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের হারের পর সবাই এসে হিরুকে ধরল, ‘তুমি কি আগে থেকেই জানতে—বাংলাদেশ ভারতের সাথে হারবে?’
‘না রে...’
‘তাহলে?’
‘সমীকরণ মেলানোর প্যারা—বড় প্যারা! সেই অভিজ্ঞতা যার আছে, সে আর ওপথ মাড়ায় না!’ এই কথাটা হিরু আর বলল না ওদের। g
