গোল্ডেন রাইস-বিটি বেগুনের অনুমোদন নিয়ে নানা প্রশ্ন ইরি-ব্রির

আপডেট : ০৬ মে ২০২৪, ১৫:০৪

‘গোল্ডেন রাইস’ নামের ধানের নতুন জাত ও  ‘বিটি বেগুন’ চাষাবাদের অনুমোদনের জন্য ফের তৎপর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি)। আজ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জিএম শস্য গোল্ডেন রাইস ও বিটি বেগুন: বাংলাদেশে প্রবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশ্নের নিরসন জরুরি’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এতে অংশ নেয় উবিনীগ, বেলা, নয়াকৃষি আন্দোলন, নাগরিক উদ্যোগ ও জিএম বিরোধী মোর্চা। তাদের দাবি, বাংলাদেশের কৃষিতে জেনেটিকালি মডিফাইড প্রযুক্তি ব্যবহারের যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে এবং বিজ্ঞানের নামে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যেভাবে আমাদের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করছে তা বেশ উদ্বেগজনক।

বক্তারা বলেন, আজ আমরা বিশেষভাবে উপস্থিত হয়েছি দেশের দুটি প্রধান ফসল ধান এবং সবজির ওপর জেনেটিক ইঞ্জিনীয়ারিং করা, এর স্বত্ত বিদেশি কোম্পানির হাতে দিয়ে দেওয়া, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কৃষক পর্যায়ে চাষের অনুমোদনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তার বিষয়ে সাংবাদিক এবং পরিবেশ ও কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অবহিত করা এবং এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারকে আমাদের উদ্বেগ জানানো এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও কার্যক্রম গ্রহণের আহ্বান জানাতে।

বক্তারা দুটি আন্তর্জাতিক খবরের ওপর জোর দেন। এক, গত ৪ এপ্রিল ব্রি ও ইরির কর্মকর্তারা কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুস শহীদের সঙ্গে দেখা করে জিএমও গোল্ডেন রাইস জাত অবমুক্তির বিষয়ে তার সহযোগিতা চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাসও দেন কৃষিমন্ত্রী।

আর দুই,  গত ১৭ এপ্রিল ফিলিপাইনের কোর্ট অব আপিল সুনির্দিষ্টিভাবে গোল্ডেন রাইস এবং বিটি বেগুনের বাণিজ্যিক চাষের বিরুদ্ধে একটি নির্দেশনা দেন। কারণ এ দুটি জিএম ফসলের প্রবক্তারা বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। এই মামলায় বাদী ছিল ফিলিপাইনের Magsasaka at Siyentipiko para sa Pag-unlad Agrikultura (Masipag) এবং Greenpeace Southeast Asia। আদালত এর আগে বিবাদী University of the Philippines Los Baños (UPLB) এবং the Philippine Rice Research Institute (PhilRice)-কে সরকারের দেওয়া বায়োসেফটি অনুমোদন বাতিল করে দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জিএম ফসল হিসেবে গোল্ডেন রাইসের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংক্রান্ত ঝুঁকি, কার্যকারিতা এবং এই ধানের আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি না এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। আমরা পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে, তারা সময় নিয়ে এর নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করছেন এবং এখনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। কিন্তু কোম্পানি এবং উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে তাড়া দেওয়া হচ্ছে। তারা সরাসরি সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।

গোল্ডেন রাইস সারা বিশ্বে বিতর্কিত। ফিলিপাইনে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলা হলেও এখন তা বাতিল করা হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে ফিলিপিনো কৃষকরা ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। কাজেই ফিলিপাইনের উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশে অনুমোদন নেওয়ার কোনো অর্থ নেই।

তাদের অভিযোগ, দাবি করা হচ্ছে এবং প্রচারণা চালানো হচ্ছে গোল্ডেন রাইস ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ। বলা হচ্ছে এর মধ্যে কেরটিনয়েড রয়েছে এবং মানুষের শরীরে হজম হতে গিয়ে এটা ভাঙ্গে এবং ভেঙ্গে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়। এটা অনুমান। যদি অনুমান সত্যি ধরেও নেওয়া হয় তাহলে জানতে হবে এই ভাত খেলে কী পরিমান কেরোটিনয়েড ভাত থেকে আলাদা করে শরীর গ্রহণ করতে পারে এবং তা ভেঙ্গে তার রূপান্তর ঘটিয়ে কী পরিমান ভিটামিন এ বানাতে সক্ষম হয়। গোল্ডেন রাইস খাইয়ে দিলেই সেটা আপনাআপনি 'ভিটামিন-এ' হয়ে যাবে না। 

অথচ গোল্ডেন রাইসের সংযোজিত কেরোটিনয়েড কিভাবে এবং কী পরিমাণ ভিটামিন-এ হিসাবে মানুষের শরীর বানাতে পারবে সেই গোড়ার তথ্যের জায়গাতেই উপাত্তের অভাব রয়েছে। আরও জানা দরকার যে এই ধান ঘরে রাখলে, গুদামজাত করলে এবং রান্নার পরে শেষ পর্যন্ত কী পরিমান কেরোটিনয়েড টিকে থাকবে? এই বিষয়ে কোনো উপাত্ত এখনো নেই। সেই তথ্য উপাত্ত ঠিক না করেই তারা ছাড়পত্রের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এটা যেন শুধু একটা কাগজের ব্যাপার। এর সাথে পরিবেশ, স্বাস্থ্য, কৃষকের অধিকার সব কিছু অঙ্গাঙ্গি জড়িত। 'ছাড়পত্র' দিলেই সেসব নিশ্চয়তা মিলবে না।

বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশান এই গোল্ডেন রাইসকে পুষ্টির একটি মাধ্যম হিসেবে দিয়ে দাতব্য ভাব দেখাতে চাচ্ছে। তারা দাবি করছে ভিটামিন-এ ঘাটতি এবং রাতকানা রোগের জন্য এই ধানের ভাত খেতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন-এ পাওয়ার উৎস আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার মধ্যেই আছে।

আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবজি বেগুনেও জেনেটিক ইঞ্জিনীয়ারিং করা হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে বিটি বেগুন। প্রাণের গঠন সংকেতে (Gene) বিকৃতি ঘটাতে সক্ষম সেই ধরনের প্রযুক্তি (Genetic Engineering) ব্যবহার করে বেগুনে বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস (বিটি) ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্রিসটাল জিন বেগুনে সংযোজন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে বেগুনের ফল ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ভারতের মহারাষ্ট্র হাইব্রিড বীজ কোম্পানি মাহিকো বহুজাতিক বীজ কোম্পানি মনসান্টোর সহায়তায় বেগুনের জিন বিকৃতির এ কাজটি সম্পন্ন করে ২০০৫ সালে। 

বক্তারা জানান, বিটি বেগুন গবেষণা একই সঙ্গে ভারত ও ফিলিপাইনে করা হলেও, এসব দেশে কোন ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় বহুজাতিক কোম্পানি মনসান্টোর স্থানীয় সহায়ক মাহিকো উদ্ভাবিত বিটি বেগুন ছাড়ের ওপর মরেটোরিয়াম জারি করেছে ২০১০ সালে। এমনকি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন প্যানেল অনির্দিষ্টকালের জন্য জিএম ফসলের সবরকম মাঠ পরীক্ষা বন্ধের সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনের কোর্টে গ্রীনপিস দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বিটি বেগুনের মাঠ পর্যায়ের গবেষণা বন্ধের জন্যে ২০১৩ সালে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। জানা গেছে, যে ভারতে ছাড়পত্র পেতে ব্যর্থ হয়ে তারা প্রথম ফিলিপাইনে চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু সেখানেও সফল না হয়ে তাদের শেষ চেষ্টা ছিল বাংলাদেশ।

যেসব প্রশ্নের নিরসন জরুরি

আমরা সরকারের কাছে দাবি করছি বাংলাদেশে বিতর্কিত জিএম ফসল প্রবর্তনের আগে জনগণের কাছে যে সব প্রশ্নের উত্তর পরিস্কার হওয়া দরকার, তা হচ্ছে:

১। কৃষি বৈচিত্র্যের দেশের গোল্ডেন রাইস ধান এবং বিটি বেগুন প্রবর্তনের আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি? নেই দুটো ফসল যে কারণে করা হচ্ছে তার সমাধান আমাদের আছে।

২। জিএম ফসলের পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য ঝুঁকির যে সম্ভাবনা আছে বলে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন এবং গবেষণা করেছেন, তার ব্যাপারে ব্রি এবং বারিতে কোনো তথ্য আছে কিনা। তারা নিশ্চিত কিনা যে এই দুটি জিএম ফসল নিরাপদ। সে রকম কোনো প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে কিনা।

৩। ভিটামিন এ ঘাটতির অজুহাতে গোল্ডেন রাইস প্রবর্তন না করে দেশে ভিটামিন এ সমৃদ্ধ সবজি, ফল, শাক, ইত্যাদি উৎপাদনে সহায়তা করা হচ্ছে না কেন?

৪। ব্রি-২৯ এর পেটেন্ট সিনজেন্টা কোম্পানিকে দিয়ে দেওয়া হলে দেশের কোটি কোটি কৃষকের ধানের এই জাত চাষ করা অধিকার কি ক্ষুন্ন হবে না? এই ধান বহুজাতিক কোম্পানিকে দেওয়া হল কেন?

৫। কীটনাশক ব্যবহার কমাবার কথা বলে বিটি বেগুন প্রবর্তন করা হচ্ছে অথচ ধান থেকে শুরু করে সব ধরনের হাইব্রিড ফসলে ব্যাপকভাবে কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহার করা হচ্ছে? এগুলো বন্ধ করা হচ্ছে না কেন?

বাংলাদেশের মানুষ, পরিবেশবিদ, এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে কৃষিতে কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করে 'নিরাপদ ও পরিবেশ সম্মত খাদ্য উৎপাদনের জন্য দাবি করছেন। বর্তমানে অসংক্রামক রোগ অত্যন্ত বেড়ে গেছে এবং সব মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ শুধু এই অসংক্রামক রোগের কারণেই হচ্ছে, যার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম প্রধান রোগ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর নতুন রোগীর সংখ্যায় বেড়ে চলেছে। জিএমও আরো নতুন স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করছে যা কৃষক এবং ভোক্তা উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আশা করছি, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বায়োসেফটি কমিটি এই সব বিষয়গুলো ভালভাবে পরখ করবেন। এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছৌ বিষয়গুলো নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহবান জানাচ্ছি।

এ সময় ছিলেন জিএমও বিরোধী মোর্চার চেয়ারম্যান ইবনুল সাঈদ রানা, বীজ বিস্তার ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ডক্টর এম এ সোবহান, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন ও বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট বদরুল আলম।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি