প্রবন্ধ

ত্রাণ পাঠানোই কী একমাত্র কাজ

আপডেট : ০৬ মে ২০২৪, ১৭:৩৮

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় মানবিক সংকট তীব্র হচ্ছে। চলমান ইসরায়েলি হামলা ৮০ ভাগ বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী সেখানে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে চলেছে ৫ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ। 

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, উত্তর গাজায় প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ গাজায় ত্রাণ পৌঁছাতে বিমান থেকে ত্রাণ নিক্ষেপ ও কৃত্রিম জেটি তৈরির মতো কঠিন কাজে হাত দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট সম্প্রতি সম্পাদকীয় পাতায় এমন মন্তব্য ছেপেছিল, ‘গাজায় সড়কপথে ত্রাণ পৌঁছানোর মতো সহজ কাজ ছেড়ে জটিল কাজে হাত দেওয়া হয়েছে’।

ইসরায়েল ফিলিস্তিন সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কিছুই আসলে এত সরল নয়, বাহ্যত যেমনটা মনে হয়। এক্ষেত্রে গাজায় মানবিক বিপর্যয়ই একমাত্র সমস্যা নয়, ত্রাণ পাঠানো এবং জায়গামতো পৌঁছানো আরেকটি বড় সংকট। ত্রাণ পাঠানো এবং সেটি সঠিকভাবে বণ্টন করা দুইটি ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। সংঘাত শুরুর আগে গাজায় প্রতিদিন মিশর ও ইসরায়েল থেকে ৫০০-এর মতো ট্রাক ঢুকত। ফিলিস্তিনের জন্য জাতিসংঘ ত্রাণ সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) ঐ কাজ তত্ত্বাবধান করত। 

জাতিসংঘের হিসাব মতে, সেই সংখ্যা এখন ১৫০-এ নেমে এসেছে। খান ইউনিসে হামলা চলাকালে কোনো কোনো দিন সংখ্যাটি ১০-এ নেমে এসেছিল। প্রতি মুহূর্তে সেখানে আহত ও নিহতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, এ অবস্থায় যখন সেখানে বেশি করে ত্রাণ পাঠানো প্রয়োজন, তখন সেটি নানা ছুতোয় আটকে দিচ্ছে ইসরায়েল। যেমন পরিদর্শন ও তল্লাশির নাম করে ট্রাকগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে।

ত্রাণবাহী গাড়িগুলো ঢোকার মোটামুটি দুইটি পথই রয়েছে। দক্ষিণ গাজার ইসরায়েল সীমান্তে কারাম শেলম ক্রসিং এবং মিশর সীমান্তে রাফা ক্রসিং। এছাড়া উত্তর গাজার ইরেজ সীমান্তে ইসরায়েলের সঙ্গে আরেকটি ক্রসিং রয়েছে, যা ৭ অক্টোবর লড়াই শুরুর পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইরেজ ক্রসিংয়ের খুব কাছেই ইসরায়েলের আশদোদ বন্দর। 

অনেকে বলছেন, এই চেক পয়েন্টটি খুলে দিলে ঐ বন্দর দিয়ে খুব সহজে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব। ইসরায়েলের দাবি—হামাস ত্রাণ বহরের মাধ্যমে সামরিক সরঞ্জামাদি নিয়ে আসতে পারে। এই কারণে সেগুলো তাদের তল্লাশি করতে হবেই। বাস্তবতা হলো—বাইরের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পাঠানো ত্রাণের ওপর হামাসের কোনো কর্তৃত্ব নেই।

আগেই বলা হয়েছে গাজা এখন এক ধ্বংসস্তূপ। ইসরায়েলের টানা হামলায় সেখানে সব বাড়িঘর প্রায় বিধ্বস্ত। ত্রাণ যদি সেখানে পাঠানোও যায়, সেগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থাপনা পাওয়া যাবে না। বিষয়টি ত্রাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাদের দাপ্তরিক কাজগুলোও করতে হবে খোলা আকাশের নিচে। এছাড়া ডেলিভারি রুট না থাকা তাদের জন্য বৃহত্ আরেকটি সমস্যা। হামাসের টিকে থাকার ক্ষমতা যেভাবেই হোক ইসরায়েলের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ১৭ বছর অবরুদ্ধ থেকেও তারা একদিকে যেমন শত শত মাইল টানেল তৈরি করেছে, অন্যদিকে সংযোজন করেছে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র রকেট। বিষয়টি ত্রাণবাহী ট্রাক বহর গাজায় ঢুকতে না দিতে ইসরায়েলকে অধিকতর অনাগ্রহী করেছে।

গাজা খুব বড় কোনো জায়গা নয়। এর সীমান্ত ক্রসিংও হাতেগোনা কয়েকটি। তাছাড়া গত ছয় মাসের একতরফা হামলায় এতে যোগাযোগ অবকাঠামো বলতে যা ছিল, তার সবই ধ্বংস হয়ে গেছে। ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট যা আছে, সামরিক বাহিনীর বিশেষ যানই কেবল সেগুলো ব্যবহার করতে পারে, সাধারণ যানবাহনের পক্ষে ঐসব সড়ক ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ইসরায়েলের অভিযোগ হামাস অতর্কিত হামলা চালিয়ে ত্রাণবহর থেকে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করছে।

ইসরায়েল চায় গাজায় ত্রাণ বণ্টন প্রক্রিয়ায় হামাস যেন যুক্ত না থাকতে না পারে। যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম জেটি তৈরির উদ্যোগ নিলেও সেখানে সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। পশ্চিমা কোনো দেশই ত্রাণ তদারকের জন্য গাজায় বা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয়। কারণ হামাসের যে কোনো হামলার দায় তাদের নিতে হবে। এটি কোনো দেশই নিতে চাইবে না। ইসরায়েলের আরেকটি প্রস্তাব হলো গাজার বেসামরিক লোকজন ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সমম্বয় করে কোনো ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে সে রকম কোনো কিছু করার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। কারণ মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন পিএর কোনো লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়ার সামর্থ্য আছে কি না, সেটাও এক বড় প্রশ্ন। এদিকে যুদ্ধ সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজায় নতুন সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। সেটি করা হলেও ক্ষুদ্র ভূখণ্ডটি আরো খণ্ডিত হয়ে পড়বে।

ইত্তেফাক/এএইচপি