শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

এক মাসে বজ্রপাতে ৮১ জনের প্রাণহানি

  • আগামী দুই মাসে বজ্রপাত বৃদ্ধির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
  • নিহতদের অধিকাংশই কৃষক
আপডেট : ১০ মে ২০২৪, ০৩:০০

আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বজ্রপাত। প্রতিদিনই বজ্রাঘাতে প্রানহানী ঘটছে। গত এক মাসে বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ৮১ জনের। এদের অধিকাংশই কৃষক। গতকাল বৃহস্পতিবারও দেশে অন্তত: ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তন,তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি অপর্যাপ্ত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং বড় বৃক্ষের অনুপস্থিতিকে বজ্রপাতজনিত প্রানহানির কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। গরম বেশি হওয়ায় চলতি বছর বেশি বজ্র্রপাত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়া গবেষক অধ্যাপক ফেরদৌস আহমেদ বলেন,চলতি মৌসুমে তাপদাহ বেশি হওয়ার কারণে বজ্রপাত বেশি হবে। আর একই সঙ্গে বর্ষাকালের দৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কারণে আগামী দুই মাস বজ্রপাতের পরিমাণও বেশি হবে। অন্যদিকে বজ্র্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং অসচেতনতার কারণে মৃত্যুও বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে আবহাওয়ার ধরণ ও বৈশিষ্ট্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ,শৈত্যপ্রবাহ এবং ঋতু পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটছে। এ কারণেই বজ্রপাত বাড়ছে। 

জাতিসংঘ বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যায়। বাংলাদেশে গাছপালা কেটে ফেলা বিশেষ করে খোলা মাঠে উঁচু গাছ ধ্বংস করে ফেলা,প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়া এবং অসচেতনতার কারণে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমানোর জন্য তালগাছ লাগানোর প্রকল্প,লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর (সংকেতব্যবস্থা),লাইটনিং অ্যারেস্টার প্রকল্প গ্রহন করা হলেও তা সফল হয়নি।এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ১ হাজার ৩২১ কোটি টাকা ব্যায়ে দেশের ১৫টি জেলায় ৬ হাজার ৭৯৩টি বজ্রনিরোধক দ্ল বসানো ও ৩ হাজার ৩৯৮টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্পের প্রস্তাব হাতে নিয়েছে।

বজ্রপাতে ৮১ জনের মৃত্যু: স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টোর্ম অ্যাওয়ারনেস (এসএসটিএএফ) ফোরাম গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে,দেশে চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত ৩৮ দিনে বজ্রপাতে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়াদের মধ্যে বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই  প্রতিবেদন প্রকাশের পর গতকাল আরো ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিল মাসে বজ্রপাতে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ২০ জন ও নারী ১১ জন। আর মে মাসের গত ৮ দিনে ৪৩ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৩৪ জন পুরুষ ও ৯ জন নারী। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৫ জনই কৃষক ছিলেন।

আগামী দুই মাসে বজ্রপাত বৃদ্ধির আশংকা:এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশী হয়। চলতি মে থেকে সামনের দুই মাসে বজ্রপাত অতিমাত্রায় বৃদ্ধির আশংকা রয়েছে। পিয়ার-রিভিউ জার্নাল হেলিয়ন-এ ‘বাংলাদেশে বজ্রপাত পরিস্থিতির ওপর জিআইএস(জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম)-ভিত্তিক স্থানিক বিশ্লেষণ' প্রতিবেদনে বাংলাদেশে প্রধান গবেষক অধ্যাপক ফেরদৌস আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এবার বজ্রপাতের আশঙ্কা বাংলাদেশে বেশি। মেঘের সঙ্গে তাপের একটা সম্পর্ক আছে। তাপ বেশি হলে মেঘে কেমিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল প্রোপার্টি বেশি হবে। আমাদের এখানে বর্ষা শুরু হয় আগস্টের শেষের দিকে। কিন্তু এবার আগেই শুরু হয়ে গেছে। ফলে এবার বজ্র্রপাত বেশি হতেই পারে।

শতকোটি টাকার তালগাছ কৌশল ব্যর্থ, আসছে বজ্রনিরোধক দ্ল বসানোর প্রকল্প:দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের আওতায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে সারা দেশে ৪০ লাখ তালগাছের চারা লাগানোর উদ্যোগ নেয়। দুই বছর না যেতেই দেখা যায়, তালগাছের চারা কোথাও মরে গেছে, কোথাও চারা না লাগিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান ২০২২ সালের ১১ মে সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেন, তালগাছ লাগানোর কার্যক্রমটি বাতিল হয়েছে। একটি তালগাছ বড় হতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৪০ বছর। এত সময় ধরে অপেক্ষার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সারা দেশে ৪০ লাখ তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, এতে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমবে। প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ও হয়েছিল।

গতকাল ৭ জনের মৃত্যু: নরসিংদীতে দুই জনের মৃত্যু, গুরুতর আহত ২:নরসিংদী প্রতিনিধি জানান,কৃষিকাজ করার সময় নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা ইউনিয়নের ভাটপাড?া এলাকার চাকশাল কদমতলায় বজ্রপাতে দুই জন মারা গেছেন। এসময় আরও ২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

বোয়ালখালীতে আহত কৃষকের মৃত্যু

চট্টগ্রাম অফিস জানায়,বোয়ালখালীতে বজ্রপাতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেছেন উত্তম চৌধুরী (৫৫) নামের এক কৃষক। তিনি আমুচিয়া ইউনিয়নের পূর্ব ধোরলা গ্রামের মৃত লাল মোহন চৌধুরীর ছেলে। বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়।

ইত্তেফাক/এএইচপি