‘সবকিছুর কষ্ট সহ্য হয়, কিন্তু পানির কষ্ট যে সহ্য করা যায় না। বৃষ্টির পানি শেষ হওয়ার পর থেকে পানি টানার এ কাজ শুরু, সামনের বর্ষা মৌসুম পর্যন্ত এভাবেই পানি টেনে আমাদের তেষ্টা মেটাতে হবে’—পঞ্চান্ন বছর বয়সি মৈফুল বিবি কথাটুকু শেষ করেই কলস কাঁখে সতীর্থদের সঙ্গে মিলে বাড়ির পথ ধরেন। আইলা আক্রান্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার ৯ নম্বর সোরা গ্রামের নদীর চরে দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প পুকুর থেকে কর্দমাক্ত পানি সংগ্রহ করতেই তারা কাঠফাটা দুপুরে বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে এসেছেন। আক্ষেপ ভরা কণ্ঠে তাদের সবারই অভিন্ন অভিযোগ ‘কত লেখালেখি হলো, কত বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু আমাগো পানির কষ্ট দুর হলো না।’
তীব্র দাবদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শ্যামনগরের উপকূলীয় মানুষের জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘরে বৈদ্যুতিক ফ্যানের বাতাসেও যেন আগুনের হাওয়া। অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানির তীব্র-সংকটে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোয় বাড়ছে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা।
কৈখালী, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া, গাবুরা ও মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের ভুক্তভোগী মানুষরা জানান, চারদিকে পানি থাকলেও পানীয় জলের তীব্র সংকট। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, ‘দেশে চিংড়ি ঘের আসায় বড় লোকরা খাল বিল ও মিষ্টি পানির পুকুরগুলোতেই নদীর লবণ পানি উঠিয়ে চিংড়ি চাষ করায় আমরা পড়েছি পানির সংকটে। পরিবারের চাহিদা মেটাতে পানির জন্য কলসি হাতে দূর-দূরান্তে ছুটছে মানুষ। সুপেয় পানির সংকট এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা। সরকার আমাদের পানির ড্রাম দিলেও তা পাচ্ছে টাকার বিনিময় বড় লোকরা।’ তীব্র খরতাপ বৈশাখে এলাকার বেশিরভাগ খাল ও পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় কোথাও গোসল এবং খাওয়ার পানি মিলছে না। মাটির নিচে পানি লবণাক্ত হওয়ায় লোকজনকে আর্সেনিকযুক্ত নলকূপ, নোংরা পুকুরের পানি পান করতে হচ্ছে। এসব পানি পান করে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
হেতালখালী গ্রামের কৃষাণি লতা রানী বলেন, ‘চিংড়ি ঘেরের কারণে সারা বছরই আমাদের খাওয়ার জলসহ ব্যবহারোপযোগী জলের সংকট ভোগ করতে হয়। গরমের সময় দুই-তিন মাস আমাদের বেশি কষ্ট হয়।’ পানি নিয়ে এমন হাহাকার গোটা উপকুলীয় জনপদ জুড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে পানির ব্যবস্থা না করলে এখানকার মানুষ তীব্র পানি সংকটে পড়বে। এতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর শ্যামনগর উপজেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এই এলাকার ৪০/৬০ শতাংশ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে রয়েছে। সরকারিভাবে এ তথ্য দেওয়া হলেও বাস্তবচিত্র আরো ভয়াবহ বলে দাবি স্থানীয়দের। শ্যামনগর উপকূলের মানুষ খাওয়ার এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য মূলত পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। তবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ এবং নদীর প্রবাহ বাঁধ দিয়ে আটকে দেওয়া, পুকুর ভরাট ও খাল বেদখলের কারণে প্রান্তিক মানুষ নিরাপদ পানির তীব্র সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানের তথ্যমতে, উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নে সরকারি খাওয়ার পুকুর আছে ২২টি, পানির ফিল্টার আছে ৬৫৬টি, অকেজো রয়েছে ১৮৫টি, গভীর নলকূপ ২ হাজার, অগভীর নলকূপ আছে ৫০০, আরো মেশিন রয়েছে পাঁচটি, সুপেয় পানির সমস্যা সমাধানে পানির ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছে ৩ হাজার।
শ্যামনগর সদর হাসপাতালের আরএমও ডাক্তার গাজী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘গরম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বেশিরভাগ শিশু ও বৃদ্ধাদের ডায়রিয়া, আমাশা, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে।’ শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজবুল আলম বলেন, ‘পানির সমস্যা সমাধানে আমরা বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রহণ করছি।’