মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

আবারও বাড়বে তাপমাত্রা, মে মাসের শেষদিকে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড়

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ০২:৪৬

টানা একমাসের লম্বা সময় ধরে তীব্র তাপপ্রবাহের পর চলতি মাসের শুরু থেকে বৃষ্টিতে ক্রমশঃ স্বস্তি ফিরেছে সারাদেশে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। কেটেছে গরমের দাপট। বৃষ্টিপাতের প্রভাবে গত কয়েকদিনে দেশের কোথাও কোথাও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে। বাতাসে আর্দ্রতা হ্রাস পেয়েছে।

আবহাওয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, আবহাওয়ার এই স্বস্তিকর অবস্থা চলতে পারে আরো অন্তত চার দিন। অতঃপর বৃষ্টিপ্রবণতা শিথিল হয়ে বাড়তে থাকবে তাপমাত্রা। তবে তাপপ্রবাহ এপ্রিল মাসের চেয়ে খানিকটা কম থাকবে। ইত্যবসরে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হতে পারে লঘুচাপ থেকে নিম্নচাপের। মাসের শেষভাগে একটি নিম্নচাপ প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। বিভিন্ন আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী সেটি ধারণা করছেন তারা। শুক্রবার একই সাথে আমেরিকা ও ইউরোপিয়ানের আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। সম্ভাব্য এই ঘূর্ণিঝড়ের নাম হবে 'রিমাল'। ওমানের দেয়া এই আরবী নামের অর্থ-বালু। আগামী ২০ থেকে ২৭ মে’র মধ্যে শক্তিশালি ঘূর্ণিঝড়টি সরাসরি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূল দিয়ে স্থলভাগে উঠে আঘাত হানতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি মে মাসে বঙ্গোপসাগরে ১ থেকে ২টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে যার মধ্যে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে একটি নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। তিনি বলেন, দেশের কোথাও কোথাও এক থেকে তিনটি মৃদু ও মাঝারি এবং এক থেকে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এ মাসে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে। তবে তা এপ্রিলের মতো অবস্থায় যাবে না।

কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, বঙ্গোপসাগরে ঘূর্নিঝড় সৃষ্টি হয় মূলত বর্ষা মৌসুম শুরুর পূর্বে ও বর্ষা মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরে। বাংলাদেশের ওপর মৌসুমী বায়ু প্রবাহ শুরু হয় সাধারণত ৩০ মে’র পর থেকে ৭ জুনের মধ্যে। বর্ষা মৌসুম শুরুর পূর্বের ঘূর্ণিঝড় মৌসুম মার্চ মাসে শুরু হলেও গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে কোন ঘূর্ণিঝড়-নিম্নচাপ কিংবা লঘুচাপও সৃষ্টি হয়নি। তাই বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট পরিমাণে শক্তি জমা হয়েছে। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি যেহেতু ২০ মে’র পরে সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই এটি খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি ও শক্তিশালী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চারটি প্রধান উপাদানের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩টি উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে মধ্য ও দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে।

এই আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন আবহাওয়া মডেল বিশ্লেষণ করে জানান, আগামী ২০ থেকে ২৭ মে’র মধ্যে শক্তিশালি ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, রিমাল মে মাসের ২৩-২৫ এর মধ্যে উপকূলে আঘাত হানতে পারে। সরাসরি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূল দিয়ে স্থলভাগে উঠে আঘাত হানতে পারে।

পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঘূর্নিঝড় সম্বন্ধে জানা যাচ্ছে যে, ঘূর্নিঝড়টি সৃষ্টির সম্ভাব্য সময় ১৯-২১ মে। পূর্নিমা রাত ২৩ মে। স্থলভাগে আঘাতের সম্ভাব্য সময় ২৩-২৫ মে। স্থলভাগে আঘাতের সম্ভাব্য স্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উপকূলবর্তী যে কোনো স্থান। আঘাতের সময বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ হতে পারে বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম উপকূলে আঘাত করলে ঘণ্টায় ১৫০ -১৮০ কিলোমিটার, পূর্ব উপকূলে আঘাত করলে ঘণ্টায় ১৭০-২০০ কিলোমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহানাজ সুলতানা বলেন, বর্ষা পূর্ববর্তী সময়ে সাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি থাকে। সে হিসেবে চলতি মে মাসের শেষের দিকে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া দফতরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, লু হাওয়ার মতো তাপদাহ থেকে বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পারদ কোথাও কোথাও ২০ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কিছুটা বেশি। আগামী তিন থেকে চার দিন বৃষ্টি থাকবে, এরপর তাপমাত্রা বাড়বে। যা রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। ঢাকার তাপমাত্রা থাকবে ৩৬ থেকে ৩৮ সেলসিয়াসের মধ্যে। তিনি বলেন, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষে বা তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতে আবারও তাপমাত্রা বাড়তে পারে। তবে তা এপ্রিলের মতো প্রকট হবে না। কারণ এর মধ্যেই কোনো কোনোদিন বৃষ্টি হবে, তাই তাপ সহনীয় থাকবে। আজ শনিবার রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে এবং আগামীকাল রবিবার দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। পরের পাঁচ দিন তাপমাত্রা বাড়বে।

আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান খান বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টিপাতের প্রবণতার ধারাবাহিকতা চলতি মাসের ১২-১৩ তারিখ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। মে মাসের দীর্ঘমেয়াদী আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কিন্তু আমরা বলেছি, চলতি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুইটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। সেই লঘুচাপ থেকে একটি নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়ে আঘাত হানতে পারে। আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, আগামীকাল থেকে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে থাকবে। ১৫ মে থেকে তাপমাত্রা আরও বাড়বে। তখন রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেটের কিছু কিছু জায়গায় হয়তো বৃষ্টি থাকবে, কিন্তু অন্যান্য জায়গা থেকে কমে যাবে। ১৫ মে থেকে পুরো মাসজুড়েই তাপপ্রবাহ থাকতে পারে।

ইত্তেফাক/এসটিএম