শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

সঠিকতম ভাবনার বাস্তবায়নেই শিক্ষার সমৃদ্ধি

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ০৬:২০

একজন ভদ্রমহিলা একজন পরামর্শকের কাছে গেলেন বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে। পরামর্শক বিচ্ছেদের কারণ জিজ্ঞাসা করলে ঐ মহিলা বলেন, ‘আমি সারা দিন বাসার কাজ, রান্না, খাওয়া শেষ করে যখনই হারমোনিয়াম নিয়ে বসি, তখনই আমার স্বামী এসে আমাকে মারধর করে এবং গরম খাবার চায়। স্যার, আপনিই বলেন এইরকম স্বামীর সঙ্গে কীভাবে সংসার করা যায়?’ পরামর্শক উত্তর দিলেন, ‘আপনি ঠিক বলেছেন।’ তখন মহিলাটির স্বামী পরামর্শককে বললেন, ‘সারা দিন কষ্ট করে কাজ শেষে ক্ষুধার্ত হয়ে বাসায় ফেরার পর সে আমাকে খাবার না দিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে। তাহলে তার সঙ্গে কীভাবে আমি সংসার করতে পারি?’ পরামর্শক উত্তর দিলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন।’ তখন সামনে বসা এক ব্যক্তি পরামর্শককে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্যার আপনি দুজনকে একই উত্তর দিলেন। কীভাবে একই সময়ে দুজনই সঠিক হতে পারে? একজন তো ভুল হবেই।’ তখন পরামর্শক উত্তর দিলেন, ‘আপনিও সঠিক বলেছেন।’ এতগুলো সঠিকতার সমারোহে সঠিকতম ভাবনাটি অনুধাবন করা ভীষণ কষ্টসাধ্য নয় কি? 

স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় পাশ নম্বর ১০০-তে ৩৩। কিন্তু কেন এই ৩৩ নম্বরকে পাশ নম্বর ধরা হয় তা অনেকেই হয়তো অবগত নন। এর মূল কারণ আমাদের মধ্যে এখনো ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রভাব থেকে যাওয়া। ১৮৫৮ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম বারের মতো ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা চালু হয়। কিন্তু পাশ নম্বর কত হবে তা নির্ধারণ নিয়ে বোর্ড কর্তৃপক্ষ দ্বিধাগ্রস্ত হন এবং ব্রিটেনে পরামর্শের জন্য চিঠি লেখেন। তখন ব্রিটেনে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পাশের জন্য ৬৫ শতাংশ নম্বর পেতে হতো। সেই সময় ইংরেজরা মনে করত, বুদ্ধি ও দক্ষতায় ভারতবর্ষের মানুষ তাদের অর্ধেক। তাই ৬৫-র অর্ধেক হিসাবে পাশ নম্বর ৩২.৫ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এতে নম্বর হিসাব করতে বেশ বেগ পেতে হতো। তাই ১৮৬২ সালে গণনার সুবিধার্থে তা বৃদ্ধি করে ৩৩-এ উন্নীত করা হয়। সেই থেকে এই ৩৩ নম্বরই পাশ নম্বর হিসেবে বিবেচিত হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারত ও পাকিস্তানেও ব্রিটিশদের চালু করে দেওয়া এই সিস্টেমই চলছে।

আজ ১৬৬ বছর পর ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণ সম্পর্কে ব্রিটিশদের ধারণা কতটা কার্যকরী তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ২০২১ সালে ওয়াশিংটন বেইজড মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট (এমপিআই)-এর গবেষণা মোতাবেক ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’ পত্রিকার প্রতিবেদনে ভারতীয় আমেরিকান অভিবাসীদের শিক্ষার মান এবং আয় আমেরিকার নেটিভ সিটিজেনদের তুলনায় অনেক বেশি। আমেরিকায় একজন ভারতীয় অভিবাসীর বার্ষিক গড় আয় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। যেখানে আমেরিকার নেটিভ সিটিজেনদের বার্ষিক গড় আয় ৭৫ হাজার ডলার দেখানো হয়েছে। শুধু আমেরিকা নয়, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেও এমন চিত্রই পাওয়া যাবে। সেখানে ভারতীয় উপমহাদেশের নাগরিকেরা কর্মক্ষেত্রে সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত রয়েছে। একটি পরিসংখ্যান মতে, আমেরিকায় ভারতীয় জনসংখ্যা তাদের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ। কিন্তু বিশ্বপ্রযুক্তির রাজধানীখ্যাত সিলিকন ভ্যালির তিন ভাগের এক ভাগ প্রকৌশলী ভারতীয়।

 গুগল, অ্যাডোবি, মাইক্রোসফট, আইবিএম, টুইটারের মতো স্বনামধন্য কোম্পানির সিইও ভারতীয়। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের শীর্ষ ১০ শতাংশ কোম্পানির সিইওর আসন অলংকৃত করে রেখেছে ভারতীয়রা। প্রতি বছর ব্যবসায়ক্ষেত্রে চরম সফল ৫০০ কোম্পানির তালিকা তৈরি করে ফরচুন ম্যাগাজিন। ‘ফরচুন ফাইভ হানড্রেড’ কোম্পানির ৩০ শতাংশ সিইও হলো ভারতীয়। তথ্য সংবলিত এই বিশ্লেষণ বলছে মেধা, মনন ও দক্ষতার বিচারে বর্তমানে হিসেবটা ঠিক উলটো।

আমরা যখন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়েছি তখন শিক্ষা পদ্ধতি ছিল একরকম। পাঠ্য বইয়েই অঙ্ক থাকত, তথ্য থাকত, সেখান থেকে প্রশ্ন হতো। ফলে আমরা বইগুলোকে খুব ভালোভাবে পড়ার চেষ্টা করতাম। এরপর শিক্ষাপদ্ধতিতে বহু নির্বাচনি প্রশ্ন এলো এবং গ্রেডিং সিস্টেম চালু হলো। তারপর গ্রেডিং সিস্টেম চালু রেখেই সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি শুরু হলো। সৃজনশীল প্রশ্ন চালু থাকা অবস্থায় পাঠ্য বইগুলো গৌণ হয়ে গেল। চলল গাইড বইয়ের একচ্ছত্র রাজত্ব। আমার সন্তানদের বই পড়তে বললে বলত বই পড়ে প্রশ্ন কমন পাওয়া যায় না। তাই গাইড বই-ই আমাদের ভরসা। এখন যে শিক্ষাক্রম এসেছে সেটাও উন্নত দেশের আদলে নেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, বর্তমান শিক্ষাক্রম যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তি। এর মাধ্যমে ১০ ধরনের দক্ষতা শেখানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে। দক্ষতার বিষয়বস্তুগুলো হলো—সূক্ষ্ম চিন্তা, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যার সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সহযোগিতা, যোগাযোগ, বিশ্ব নাগরিকত্ব, স্বব্যবস্থাপনা, জীবিকায়ন, মৌলিক দক্ষতা। এই পাঠ্যক্রমেও ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জীবন-জীবিকা বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। এই শিক্ষাক্রমে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একমুখী শিক্ষার যে পরিকল্পনা তা প্রশংসনীয়। তবে গবেষণা বলছে, এই শিক্ষাক্রমে শিক্ষা উপকরণ কিনতে শিক্ষার্থীদের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সহায়তায় অ্যাসাইনমেন্ট সমাধান করার যে অপরিহার্যতা তা প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। প্রত্যেক সিস্টেমেই কিছু দুর্বলতা থাকে। তবে আমার মতে, আমার জীবদ্দশায় দেখা তিনটি শিক্ষাক্রমের প্রত্যেকটিই সমসাময়িক কর্তৃপক্ষের ভাবনায় সঠিক ছিল। তাই তো আমাদের শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের ওপর এই শিক্ষাক্রমগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে।

মানুষের জীবনে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে অর্জিত ভিত্তিজ্ঞান নিয়েই মানুষ তার উচ্চতর জ্ঞানের পরিসরকে বৃদ্ধি করে। একটি ভাবনা আমার মনকে সর্বদা আন্দোলিত করে, পশ্চিমারা যারা তাদেরকে মেধা, মনন ও দক্ষতায় আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ ভাবত, তাদের শিক্ষাক্রম অনুসরণ করে আমরা কি খুব উপকৃত হব! তাছাড়া পশ্চিমা যে দেশগুলোর শিক্ষা পদ্ধতি আমরা হুবহু অনুসরণ করতে চাই তাদের শিক্ষা খাতে ব্যয়ও আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে।

বাস্তবিক অর্থে, আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশ, সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রেখে শিক্ষার উন্নয়নের পরিকল্পনা জাতির জন্যে অধিক ফলপ্রসূ হবে। শুধু অর্থ দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। মানবজীবনের পাঁচটি গুণ বা বৈশিষ্ট্যে শিক্ষা পূর্ণতা পায়—জ্ঞান, প্রেম, ন্যায়, ধৈর্য ও সমর্পণ। কারণ ‘জ্ঞান’ বুদ্ধিকে স্থির রাখে, ‘প্রেম’ হৃদয়কে স্থির রাখে, ‘ন্যায়’ আত্মাকে স্থির রাখে, ‘ধৈর্য’ মনকে স্থির রাখে, আর ‘সমর্পণ’ শরীরের সমস্ত আবেগ শান্ত রাখে।

লেখক: উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসটিএম