সত্যি কি শিক্ষকতা পেশা মেধাবীদের টানছে না!

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:৩০

২০০৫ সালে গঠিত হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। ২০১৫ সালে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ (স্বজনপ্রীতি ও ঘুষবাণিজ্য) বন্ধ করে, এনটিআরসিএ- কে সেন্ট্রালি নিয়োগ সুপারিশের অনুমতি দেয় মন্ত্রণালয়। তাই সবাইকে নিয়ে মেধা তালিকা করায়, কোনো কোনো ব্যাচ লাভবান হলেও কোনো কোনো ব্যাচের একেবারে বিনা কারণেই সর্বনাশ হয়ে যায়। পদ্ধতির পরিবর্তন হলে মূল্যায়নের সবকিছুই ওলটপালট হয়। সেগুলো সমন্বয়ের জন্য যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলে স্নাতক-স্নাতকোত্তর করা বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধিত শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়ার কাজটা সহজ ও স্বচ্ছ হওয়ার কথা। কিন্তু এনটিআরসিএ-র ভুল: ১. অন্য দশটা পরীক্ষার মতো শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নিবন্ধিত শিক্ষকদের ইউনিক আইডি (রোল) না দেওয়া। ২. কম্বাইন্ড মেরিট তালিকা প্রণয়ন করা হলেও পিক অ্যান্ড চূজ পদ্ধতিতে নিয়োগ সুপারিশ করা। ৩. কম্বাইন্ড মেরিট তালিকায় ১-১৭টি ব্যাচে উত্তীর্ণদের যুক্ত করা; কিন্তু সুপারিশপ্রাপ্ত ইনডেক্সধারীদের তালিকা পৃথক না হওয়া। ৪. ইনডেক্সধারীদের বারবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুপারিশ এবং প্রকৃতপক্ষে বদলি করে কৃত্রিম শিক্ষক সংকট সৃষ্টি। ৫. প্রতি গণবিজ্ঞপ্তির শূন্যপদগুলো আবেদনকৃত যোগ্য প্রার্থী দ্বারা পূরণ না করা। একই প্রতিষ্ঠানে প্রতি গণবিজ্ঞপ্তিতেই একই ব্যক্তির (শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে) আবেদন নেওয়া। ৬. যোগ্য প্রার্থী থাকার পরও নতুন প্রার্থী খোঁজা এবং ক্রমান্বয়ে অপেক্ষমাণ যোগ্যদের তালিকা দীর্ঘায়িত করা। ৭. নিবন্ধিত নিয়োগ প্রার্থীদের এন্ট্রিলেভেল বয়স বিবেচনা না করে, ক্ষেত্রবিশেষে স্ব-স্ব নীতিমালা বা বিজ্ঞ আদালতের রায় প্রয়োগ না করা।

পিক অ্যান্ড চুজ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিয়োগ সুপারিশ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় প্রার্থী হাজার বার আবেদন করেও নিয়োগ বঞ্চিত ছিল। এনটিআরসিএ-র এ কৌশলের বিরুদ্ধে নিবন্ধিত শিক্ষক সংগঠনের আন্দোলনের ফলে শিক্ষক নিয়োগের অনুসরণীয় পদ্ধতির ৭ নম্বর পয়েন্ট (ইনডেক্সধারীদের আবেদনের সুযোগ) স্থগিতের মাধ্যমে এন্ট্রিলেভেলের শিক্ষক দ্বারা সকল পদ পূরণের লক্ষ্যে নিয়োগ আবেদনে পরিবর্তন আনা হয়। একজন প্রার্থী স্কুল-কলেজ এই দুই লেভেলের জন্য দুটি আবেদন করতে পারবেন এবং প্রত্যেক আবেদনের বিপরীতে চল্লিশটি প্রতিষ্ঠান চয়েস থাকবে। কেউ কলেজ নিবন্ধনের বিপরীতে নির্বাচিত না হলে স্কুল নিবন্ধনের বিপরীতে বিবেচনা করা হবে। এ দুটি প্রত্রিয়ায় নির্বাচিত না হলে শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে ইচ্ছুক হলেও থাকবে 'ইয়েস অপশন'। কিন্তু চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তির প্রাথমিক সুপারিশে দেখা গেল, ৬৮ হাজার শূন্য পদে সুপারিশ পেল মাত্র ২৭ হাজার, চূড়ান্ত নিয়োগ পেল আরো কম। পদ ফাঁকা থাকল ৪০ হাজারের ওপরে। ধরা যাক-'ক' নামক ব্যক্তি স্কুল ও কলেজ উভয় নিবন্ধনের বিপরীতে আবেদন করেছেন। 'ক'-এর আবেদনকৃত কলেজ শাখার ৯টি প্রতিষ্ঠান এবং স্কুল শাখার ১১টি প্রতিষ্ঠানে পদ ফাঁকা থাকে। পঞ্চম গণবিজ্ঞপ্তিতেও শিক্ষক চাহিদার আবেদন নেওয়া হয় ঐ ফাঁকা পদগুলোর জন্য। এক আবেদনের ৪০টি চয়েসের মধ্যেই যদি পদ ফাঁকা থাকে তাহলে ইয়েস অপশন' রাখার যৌক্তিকতা কী? এছাড়াও একাধিক ব্যক্তির এবং একাধিক ব্যাচের একই বিষয়ের একই রোল রয়েছে। রোল একই হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে একই ব্যক্তি বারবার সুপারিশপ্রাপ্ত হন। সুপারিশকৃত ব্যক্তি ইনডেক্সধারী বা অবৈধ সনদধারী হলে চূড়ান্ত সুপারিশ থেকে প্রাথমিক সুপারিশকৃত ব্যক্তি বাদ পড়ে যান। কিন্তু ঐ শূন্যপদগুলো আবেদনকৃতদের মধ্য থেকে পূরণ করা হয় না। এভাবে একই রোলের বাকিরা প্রতিবারই নিয়োগ সুপারিশ বঞ্চিত হন। প্রশ্ন হচ্ছে, একই ব্যক্তিকে কেন একই প্রতিষ্ঠানে প্রতি গণবিজ্ঞপ্তিতেই আবেদন করতে হবে?

নিবন্ধন সনদ অর্জন করে বারবার নিয়োগ বঞ্চিত হওয়াদের নিয়োগের ব্যবস্থা না করে, নতুন করে পরীক্ষা নিয়ে প্রার্থী খোঁজা কেন? শিক্ষক সংকট দূর করতে এনটিআরসিএ-র হাতে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছে। বছরের পর বছর চাহিদা দিয়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক পাচ্ছে না। বর্তমানে শূন্যপদ ৭৮ হাজার। জাল সনদে চাকরিরতদের চিহ্নিত করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যথাযথ শূন্যপদের চাহিদা নিলে শূন্যপদ দেড় লাখের ওপরে হবে। বর্তমানে আগামী তিন বছরের শূন্যপদের চাহিদা নেওয়া হচ্ছে। এতে শূন্যপদ দুই লক্ষ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষকের এমএড-বিএড এবং শিক্ষক নিবন্ধন সনদসহ পিডিএস আইডি থাকা সত্ত্বেও হচ্ছেন বৈষম্যের শিকার। গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করে তাদের শতভাগ বেতনভাতা দেওয়া উচিত। কিন্তু তার আগে বারবার নিয়োগ বঞ্চিত স্নাতক-স্নাতকোত্তর বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধিত চাকরি প্রত্যাশীদের এন্ট্রিলেভেল বয়স বিবেচনা করে নিয়োগ দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।

ইত্তেফাক/এনএন