মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ডিলারকে বাঁচাতে আপস-মীমাংসার প্রস্তাব খাদ্য কর্মকর্তার 

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ১৫:৫৪

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার এনামুল হক ভরসাকে বাঁচাতে সাংবাদিকসহ অভিযোগকারীকে বসে আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দিয়েছেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাসনা আখতার। তিনি সাংবাদিকদের ডেকে ভোক্তার সাথে ডিলারের আপস-মীমাংসা করার অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছেন। ইতিমধ্যে তার এ কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি আদিতমারী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাসনা আখতার একজন সংবাদকর্মীকে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ডেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার এনামুল হক ভরসাকে বাঁচাতে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছেন। এসময় তিনি অভিযোগকারী ও সংবাদকর্মীদের একসাথে বসে বিষয়টি মীমাংসা করার কথা বলেন। বিনিময়ে ওই ডিলারের কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা নিয়ে দেয়ারও প্রস্তাব করেন। এসময় তিনি অভিযোগকারী ও সংবাদকর্মীদের জেলা প্রশাসকের নিকট গিয়ে বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে বলে এমন প্রস্তাব রাখেন। এতে করে ওই ডিলার ক্ষমা পাবেন বলে তিনি দাবী করেন। তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ তদন্ত রিপোর্ট জেলা প্রশাসকের নিকট ইউএনও প্রেরণ করেছেন। এখন আর উপজেলা থেকে তাকে বাঁচানোর কোন পথ নেই।

একটি পরিবারে দুইটি কার্ড তবু ৮ বছরে মিলেনি এক ছটাক চাল! শিরোনামে একটি প্রতিবেদন গত ২৮ মার্চ ইত্তেফাকের অনলাইনে প্রকাশ হলে পুরো প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর একাধিকবার তদন্ত করে এর সত্যতা পেয়েছেন তদন্ত কমিটি। সেই সাথে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাসনা আখতার উল্টো অভিযোগকারীদের শোকজ করার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।

জানা গেছে, একই পরিবারে স্বামী স্ত্রী দু'জনের কার্ড করে নিয়ে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আত্মসাৎ করা ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে  গত ২৭ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগী দিনমজুর মমিনুর ইসলাম।

মনিনুর ইসলাম লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের মহিষাশ্বর ম্যালম্যালির বাজার এলাকার মৃত আব্দুস সামাদের ছেলে। ছকিনা খাতুন তারই স্ত্রী।

হতদরিদ্র শ্রমিক দিনমজুর পরিবারের মানুষদের মাঝে অল্প মূল্যে চাল বিক্রি করতে সরকার খাদ্য বান্ধব কর্মসূচি চালু করে। প্রথম দিকে ভর্তুকি মূল্যে ১০ টাকা কেজি দরে পরিবার প্রতি ৩০ কেজি হারে চাল বিক্রি শুরু করে সরকার। পরবর্তীতে দাম বাড়িয়ে ১৫ টাকা কেজি দর করা হয়। স্থানীয়রা এ কারণে এ কার্ডকে ১০ টাকার কার্ড নামেই জানেন।

অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার এনামুল হক ভরসা চালের কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ২০১৬ সালে দিনমজুর মমিনুর ইসলামের কাছ থেকে তার নিজের ও তার মায়ের পরিচয়পত্রের ফটোকপি সংগ্রহ করেন। পরিচয় পত্র নিয়ে উপজেলা খাদ্য অফিস থেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড করলেও তা মমিনুর ইসলামের কাছে গোপন রাখেন ডিলার ভরসা।

গত ২০১৮ সালে মমিনুর ইসলামের মা রশিদা বেগম মারা গেলেও তার নামে বরাদ্দের চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন ডিলার এনামুল হক ভরসা। অপর দিকে গেল বছর সরকার কার্ডধারীদের তথ্য ডিজিটাল করায় বিপাকে পড়েন ডিলার এনামুল হক ভরসা। কারণ, কার্ডধারীর আপডেট ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ লাগবে। তখন কৌশলে ডিলার এনামুল হক ভরসা  মৃত কার্ডধারী রশিদার পুত্রবধূ ছকিনার নামে কার্ড করে দেয়ার কথা বলে ছকিনার ও তার স্বামী মমিনুর ইসলামের ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করেন।

এরপর মৃত রশিদার স্থলে তার পুত্রবধূ ছকিনার নামে কার্ড তৈরি করেন ডিলার ভরসা। একই সাথে দিনমজুর মমিনুর ইসলামের নামে কার্ডেও তথ্য ডিজিটালে হালনাগাদ করে কার্ড দুটি নিজের কাছেই রেখে দেন ডিলার এনামুল হক ভরসা। স্ত্রী ছকিনার নামের কার্ডটির জন্য দীর্ঘ দিন ধরে দিনমজুর মমিনুর নিস্ফল ঘুরেছেন ডিলারের দুয়ারে।

গত মাসের চাল বিতরণকালে উপজেলা খাদ্য বিভাগ ডিলারদের মাঝে কার্ডধারীদের তালিকা নতুন করে বণ্টন করেন। এতে শফিকুল ইসলাম নামে এক ডিলারের হাতে পড়ে মমিনুরের স্ত্রী ছকিনার নামের কার্ড। সেই কার্ডে চাল নিতে আসেন ডিলার এনামুল হক ভরসার দোকানের কর্মচারী নাইম। এতে সন্দেহ হওয়ায় ছকিনা বেগমকে ফোন করেন নতুন ডিলার শফিকুল ইসলাম। তখন মমিনুরের পরিবার জানতে পারেন ছকিনার নামে খাদ্যবান্ধবের কার্ড হয়েছে। কার্ড হয়েছে মর্মে স্বীকার করলেও ৫হাজার টাকা না দিলে কার্ড দিবে না বলে জানায় ডিলার এনামুল হক ভরসা।

নিরুপায় দিনমজুর মমিনুর ইসলাম অল্প দামে চাল পেতে ডিলার ভরসাকে ঋণে নেয়া ২ হাজার টাকা দেন কার্ডটি ফেরত পেতে। টাকা নিলেও কার্ড বা চাল কোনটাই দেননি ভরসা। উপজেলা খাদ্য অফিসে গিয়েও কোন কর্মকর্তা কর্মচারী দিনমজুর মমিনুরকে সহায়তা করেননি। বরং ডিলার ভরসার বিরুদ্ধে না গিয়ে ভরসার কথামত চলতে বলা হয়।

পরে অন্য মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালুর দিন হতে দিনমজুর মমিনুর ইসলামের নামে কার্ড ও চাল বরাদ্দ ছিল। যার কার্ড নম্বর-১৬৯ এবং তার মৃত মা রশিদার পরিবর্তে তার স্ত্রী ছকিনার কার্ড নম্বর ১৪৮০ নামেও কার্ড চাল বরাদ্দ ছিল। পরিবারে দুইটি কার্ড থাকার পরেও এক ছটাক চাল কিনতে পারেননি দিনমজুর মমিনুর ইসলাম ছকিনা দম্পতি।

অবশেষে ২৭ মার্চ তাদের নামে বরাদ্দকৃত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড ও দীর্ঘ দিন ধরে আত্মসাৎ করা চাল উদ্ধার এবং অভিযুক্ত ডিলার এনামুল হক ভরসার বিরুদ্ধে বিচার দাবি করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন মমিনুর ইসলাম।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, সমবায় ও সহকারী প্রোগ্রামারকে নিয়ে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন ইউএনও। তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিজে আপস করার চাপ দেন বলে দাবি করেন অভিযোগকারী। এতে সম্মতি না দেয়ায় অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে গত ১৮ এপ্রিল শোকজের পত্র পাঠান উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাসনা আকতার। সেখানে দুই কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দাখিল করতে ব্যর্থ হলে তাদের উভয়ের কার্ড বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।

ভুক্তভোগী মমিনুর ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আমার পরিবারের নামে দুইটি কার্ড করে বিপুল পরিমাণ সরকারি চাল আত্মসাৎ করেছেন ডিলার এনামুল হক ভরসা। এতদিন খাদ্যবিভাগ তা চোখে দেখল না। আমি অভিযোগ দিলাম দুর্নীতিবাজ ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। এখন তারা দুর্নীতিবাজকে বাঁচাতে তথ্য গোপন করে না কি আমরা সরকারী সুবিধা আত্মসাৎ করেছি। তাই আমাকে শোকজ করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হুমকি দিয়েছেন। শোকজের জবাব দিয়েছি। বিচার না পেলে প্রয়োজনে আদালতে যাব। আমার পরিবারের নয়, ১৫৮৩ নম্বর কার্ডটিও ডিলার এনামুলের স্ত্রী ফাতেমার। অনেকের নামে কার্ড করে চাল আত্মসাৎ করছেন ডিলার। তদন্ত করলে বেড়িয়ে আসবে।

আদিতমারী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাসনা আখতার বলেন, ভোক্তাকে নিয়ে ডিলারের সঙ্গে আপস-মীমাংসা করে নেন। তাতে করে দুজনেরই লাভ হবে। কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি লক্ষাধিক টাকা ডিলারের কাছ থেকে নিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন। ডিলারকে কেন বাঁচাতে চাচ্ছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন থেকে তিনি পরিচিততো তাই। 

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নূর ই আলম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগকারীর অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। অভিযুক্ত ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা খাদ্যবান্ধব কমিটির কাছে সুপারিশ করেছে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটি। জেলা কমিটির সিদ্ধান্ত পেলেই তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি