সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

স্বস্তির বৃষ্টি মানুষের তুষ্টি, এডিসের সৃষ্টি

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ০৫:৩০

অনেক দিন অনাবৃষ্টি আর প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে মানুষের জীবন চরম অবস্থার মধ্যে ছিল। হিট স্ট্রোকে অনেকের মৃত্যুও হয়েছে। বেড়ে ছিল তাপজনিত কারণে রোগের প্রভাব। এমতাবস্থায় সবার মনে একটাই কামনা ছিল শান্তির বৃষ্টির। অনেক জায়গায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এসতেসকার নামাজও আদায় করে মহান আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির জন্য দোয়া ভিক্ষা করেছেন। অবশেষে শান্তির বৃষ্টিতে মানুষের মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এসেছে। প্রচণ্ড দাবদাহে মানুষের হাঁসফাঁস উঠলেও একটি বিষয়ে স্বস্তি ছিল, আর তা হলো মশার উত্পাদন। যেসব বাসায় মশারি ছাড়া ঘুমানো অতি দুষ্কর ছিল, সেই সব বাসাতেও খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে মশারি ছাড়া ঘুমানো গেছে স্বস্তির সঙ্গে। কিন্তু স্বস্তির বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে মশার উত্পাদনও বেড়ে যাচ্ছে।

এই তাপপ্রবাহের পর মশার যেসব ডিমের ডেসিকেশন রেজিসট্যান্স অনেক বেশি, সেই সব ডিমই সারভাইভ করতে পেরেছে। তাই এই অধিক জীবনীশক্তিসম্পন্ন ডিম ফুটে যেসব লার্ভা উত্পাদিত হবে, তারা অধিক শক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক হবে। এমনিতেই ২০০০ সালে থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা দুই নতুন রেকর্ড করেছে ২০২৩ সালে। ২০২৩ সালকে ডেঙ্গুর আতঙ্কের বছর বললে এতুটুকু ভুল বলা হবে না। কিন্তু সেই রেকর্ডও ভেঙে ২০২৪ সালে যে ভয়াবহতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা সত্যিই আতঙ্কের। ২০২৩ সালের এই দিনে অর্থাত্ ৮ মে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১২৩ জন এবং মৃত্যুসংখ্যা ছিল ১১ জন। আর আজ ২০২৪ সালের ৮ মে মোট আক্রান্তের পরিমাণ ২ হাজার ৩৬০ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২৮ জন। এর ওপর এই মাঝে মাঝে প্রকৃতির অশুভ ও অস্বাভাবিক আচরণ মশাকে আরো শক্তিশালী ও বেপরোয়া করে তুলছে।

কার্ভ দেখে মনে হচ্ছে প্রকৃতি এবং মানুষের সৃষ্ট সব ফ্যাক্টরগুলোই যেন মশার বংশবিস্তারের এবং রোগ ছড়ানোর পক্ষেই যাচ্ছে। কোনো দিক থেকেই যেন মানুষের অনুকূলে কিছুই নেই। নতুন বৃষ্টি মানবজীবনে স্বস্তি আনলেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে, মশার প্রজননস্থল বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। একইভাবে খানাখন্দ ও পানির স্বাভাবিক নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে আমরা সব শ্রেণি-পেশার মানুষই তৈরি করছি মশার অভয়ারণ্য। পরিবেশের যে কোনো চরম অবস্থাই মশার প্রতিরোধী হয়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তাই এই প্রতিরোধী হয়ে ওঠার তীব্রতা ও আধিক্য পরিমাপ করে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রতিরোধ বা নিয়স্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা। মশা যত শক্তিশালীই হোক, তা দমন করা তখনই সম্ভব যখন পদ্ধতিগুলো বিচ্ছিন্ন না হয়ে হবে সমন্বিত। জনস্বাস্থ্যের জন্য নির্ধারিত এসডিজি গোলসমূহ যথাযথভাবে অর্জন করতে চাইলে অবশ্যই অতি শক্তিশালী পরিকল্পনা ও সমন্বয় অত্যাবশ্যক।

শহরের জন্য যেমন গাইডলাইন দরকার, একইভাবে গ্রামের জন্য প্রয়োজন গাইডলাইনের সঙ্গে জনসচেতনতা ও সম্পৃক্ততা। মশা অতি ক্ষুদ্র পতঙ্গ হয়েও যদি এত বেশি বুদ্ধিমান ও কৌশলী হয়ে শক্তি অর্জন করতে পারে, তাহলে আমরা মানুষরা কেন নিজেদের এত বুদ্ধি থাকতে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করব।

পানির ব্যবস্থাপনা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই পারে মশার প্রজননস্থল নির্মূল করতে। বাস্তবচিত্র নিয়ে অশ্রুজলেই শুধাতে হয় আসলেই আমাদের কী করণীয়। একদিকে রহমতের বৃষ্টি পেয়ে স্বস্তির অন্তরালে কি বিলীন হয়ে যাবে প্রাপ্ত সুখটুকু। শুনেছি পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া যেমন কোনো জীবই চলতে পারে না, পারে না বাঁচতে। আবার এই পানিই বন্যার সময় জীবের জীবননাশের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিলীন হয়ে যায় অগণিত বাড়িঘর, গবাদি পশুসহ শত শত হেক্টর জমির ফসল। তাই পানি ব্যবস্থাপনা অবশ্যই হতে হয় সুপরিকল্পিত। শহরে যখন বৃষ্টি হয়, তখন তা যদি সঠিকভাবে নিষ্কাশিত না হয়, তাহলে সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতা, যা থেকেই মশা-সম্পর্কিত সব সমস্যার উত্পত্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন খাল বা লেকে নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত জমাটবদ্ধ পানি।

এই পানিতে পার্শ্ববর্তী বাড়িঘর থেকে ফেলা ময়লা-আবর্জনা পচে তৈরি হচ্ছে এক কিম্ভূতকিমাকার অবস্থা ও উদ্ভট গন্ধের। এই অবস্থা জনজীবনে অবশ্যই কোনো আরামদায়ক অনুভূতির উদ্রেক করে না, করে এক অসহনীয় পরিস্থিতির। এই চরমভাবে দূষিত জলাবদ্ধ পানি কিউলেক্স মশার ফ্যাকটরিতে পরিণত হয়েছে, যা থেকে উত্পন্ন মশা ও মাছি জনজীবনে দুর্ভোগ ও রোগজীবাণুু ছড়িয়ে চলছে। তাই তো স্বস্তির বৃষ্টি শান্তির আবেশ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক আর ভয়াবহতাই বয়ে আনে। আর প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের পর ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতার চরণ মনে পড়ে গেল—

“কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সঙ্গীত হারা

অমাবস্যার কারা

লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে

তাইতো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে”

কিন্তু আমরাও বাঙালি। যে কোনো প্রতিকূলতা আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম। ১৯৭৪ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলায় সম্পদ আছে, বাংলার সম্পদ বাংলার মানুষ’। এই মানবসম্পদ অবশ্যই সঠিকভাবে সচেতন ও সম্পূক্ত হয়ে অশনিসংকেতপুর্ণ ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পেতে জাতীয় ট্রাটোজিক প্ল্যান অনুযায়ী যদি দায়িত্ব বণ্টন করে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে কখনোই স্বস্তিদায়ক বৃষ্টির জল অশ্রুজলে রূপান্তরিত হতে পারে না। বিশ্বে সবচাইতে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত দেশ হলো ব্রাজিল। সেই দেশের ডেঙ্গুতে প্রাণহানির শতকরা হারও আমাদের দেশের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হারের চেয়ে কম। তাই জলাবদ্ধ পানির পরিসর কমিয়ে এডিসের ঘনত্ব কমানোর সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সা ব্যবস্থাপনার সহজলভ্যতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততার সঙ্গে সঙ্গে কীটতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা ও কর্মপরিধি এবং গবেষণার সুযোগ-সুবিধা ও অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে না পারলে এই নাজুক পরিস্থিতির উত্তরণ মিলবে না।

তাই এখন সময় এসেছে সমন্বিতভাবে কাজ করার। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমম্বয়ের মাধ্যমে যদি কাজ করা হয়, তবে অবশ্যই স্বস্তির বৃষ্টির পানি আশীর্বাদ হিসাবে পরিণত হবে। কখনোই মশার প্রজননক্ষেত্র বাড়ানোর কাজে ব্যবহূত হবে না, হবে উত্পাদন বাড়িয়ে দেশের সমৃদ্ধির কারণ। ব্যবহূত হবে বিশুদ্ধ পানির উত্স হিসেবে। অর্জিত হবে এসডিজির বিধিত গোল। 

লেখক :অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), মহাখালী, ঢাকা

 

ইত্তেফাক/এমএএম