মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ফুলজানের ফুলবাগিচা

আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ০৭:৪১

কোমরপুর বাজারে মুফিজের দোকানে বসে বেলাশেষের মানুষদের দিকে তাকায় ফুলজান। মানুষজন এখন অনেক সচেতন। এখন নাকি কেউই আর বেশিদিন গ্রামে পড়ে থাকতে চাইছে না। একটু গায়েগতরে বড় হতে না হতেই শহরমুখী হচ্ছে। হাটবাজারে যুবাপুরুষ এখন আর তেমন দেখা যায় না।

ফুলজান ঢাকায় এক বিশাল ফ্ল্যাটবাড়ির কেয়ারটেকার। আগে মাসান্তে গ্রামে আসত দু-একদিনের জন্য। কিন্তু এখন আর তেমনটি হয় না, দু-তিন মাসের আগে বাড়ি আসার চিন্তা করতে পারে না। কী হবে গ্রামে এসে এত ঘন-ঘন? যদিও গ্রামে এলে বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়, মন তার ভালো হয়ে যায়। ঢাকার জীবন কেমন বদ্ধ জলাশয়ের মতো। তারপরও শহর হলো বেঁচে থাকার অবলম্বন। স্বপ্ন দেখায়, সামনে চলার পথটাকে আরো বেশি পরিষ্কার করে দেখাতে শেখায়।

কিন্তু ফুলজান ভুলতে পারে না গ্রাম এবং এই গ্রামের মানুষজন প্রকৃতি। সবচেয়ে বড় কথা হলো নিজের কাছে কে না ফিরতে চায়? আগে গ্রামে কত আলতু-ফালতু কাজ করেছে দুটো পয়সা রোজগারের জন্য। রহমান হাজীর পুকুর কাটার কাজ সেও পেয়েছিল। কম খাটুনি। মাথায় ডালি করে মাটি বয়ে আনা। সারা দিন চলে যায়। কখনো আবার নজরুলের মাছের খামারে বেগার দেওয়া, বিনিময়ে কয়েক টাকা ধরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঐ গমের সময় গম বা আলুর সময় আলু মাঠ থেকে তুলতে যাওয়ার সেই দূর-দূর কোথায়। কম কি খাটুনি ছিল? অথবা ভ্যানভরতি তরিতরকারি নিয়ে ফজরের আগে শহরে নিয়ে যাওয়ার কাজটাই বা কম খাটুনির ছিল কি! ফুলজান সবই করল জীবনে। এই গ্রাম তাকে কী বা দিয়েছে—শুধু কষ্ট আর কষ্ট।

আজ সে মস্ত শহরের মানুষ বটে। টাকা-পয়সার অভাব নেই। সারা দিন বেশ আনন্দে কাটে। ফ্ল্যাটবাড়ির কেয়ারটেকার মানে অনেক সম্মান। বড়-বড় লোকদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ। কত-কত মানুষজন তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। ফ্ল্যাটবাড়ির মালিকদের উপস্থিতি জানান দিলে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেই তারাও একটু হেসে কথা বলে কখনো-সখনো। ফুলজান তখন ভুলে যায় খালগ্রামের সেই ফেলে আসা জীবনের কথা, তার সামনে রঙিন প্রজাপতির হাতছানি।

সেবার এক বেগম সাহেবা ফুলজানকে বলেছিল, তোমাদের গ্রামে আমাকে নিয়ে যাবে...

ফুলজান জানে এসব বেগম সাহেবারা কোনোদিন তাদের গ্রামে আসবে না। সবই কথার কথা। কত দেশ-বিদেশ দেখছে অথচ তাদের ভরভরে চাষাড়ে এঁদো গ্রাম কে যেতে চায়? কী বা আছে দেখার, সেই পদ্মফুল ফোটা দিঘি, শাপলা-শালুক ফোটা প্রায় শুকিয়ে যাওয়া একচিলতে হাওড়। আর মাঠের পর মাঠ, বাড়ি-বাড়ি দুঃখ-কষ্ট অভাব-দুর্দশা। এখানে না আছে কাব্য আর না আছে দেখার সুখ। শুধুই চাপ-চাপ কালো ঘোর অমানিশা...

ফুলজান তাকিয়ে থাকে দূরের সীমানা পিলারের দিকে। মাজাভাঙা ছখিনা বুড়ি আসছে এদিকে, কতোকাল ধরে বেঁচে আছে। আরো যে কতোকাল বাঁচবে কে জানে। এখনো শরীরে বেশ শক্তি আছে, দুনিয়ার কত খবর ওর কাছে। সাতকাল আগের কথা এখনো ওর মুখস্থ। ফুলজানের কাছাকাছি হতেই ঠাওর করে বুঝে ফেলে, তুই আমাগো পটলার ছোল লয়...

ফুলজান কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলে, এই বুড়ি পটলার ছেলেকে দেখেও আবার কুয়ারা মারাও...

—না রে লাতি না...তুই কবে আলি গে...

—আসলাম কনে, তোমার কোমর ধরেই তো আছি।

—আহা অমন রসিকতা কতোদিন করিস লয়...

—করবো করবো, এই বুড়ি আমারে বিয়া করবু...

—কেনে বিয়ের বুঝি বাতিক উঠছে।

—কেনো লয়।

—হ হ ঠিক তো কইছোস, গ্রামের হগলেই তো বিয়া-শাদি করে...হ্যাঁরে ছেমড়া, তোর মায়ে বিয়ের কথা কয় না...

—কইচো তো, তোমার লগে জোড়া বাঁধতে বলেছে!

—আহা ছেমড়ার ফচকেমি দেখো...তোদের জন্যই আমি বেঁচে আছি রে...কতোজনে মরে হেঁজে গেইলো আর দ্যাখ আমি ঠিক বহাল আছি আজও...কত বয়স হলো জানি না। সবাই বলে অনেক বয়স আমার। আমি তো মরি না। কেন রে মরি না বল তো?

ফুলজান কিছু বলে না। তাকিয়ে দেখে শুধু। দুনিয়ায় বুড়ির কেউ না থাকলেও দুনিয়ার সবাইকে সে নিজের আপনজন ভাবে। অনেক বাড়ির খোঁজখবর রাখে। ফুলজান জানে ছখিনা বুড়ি একটা সময় সাত গ্রামের পোয়াতি মেয়েদের অনেক উপকার করত, এমনকি ধাইয়ের কাজও করেছে। ওর হাত দিয়ে নাকি শত-শত মানুষ জীবন পেয়েছে। আজ সে বয়সের ভারে নিজেই নির্জীব, চোখেও দেখে না তেমন। চেনা মানুষকে আন্দাজে হয়তো চেনে, কিন্তু তার বেশি নয়।

ফুলজান ঝুমঝুমপুর বাজারের দিকে যেতে থাকে। আজ হাটবার। জগলুর চায়ের দোকানে অনেক বন্ধুর দেখা পাবে, সবাই কি আছে গ্রামে আজ? কে কোথায় আছে জানা তো যাবে।

হাটে গিজগিজ করছে মানুষ। সপ্তাহের বাজার-সওদা করতে সাত গ্রামের মানুষের ভিড়। ফুলজান ভিড়ের ভেতর হাঁটতে থাকে। এভাবে হাঁটতে তার ভালোই লাগে। শহরের মানুষের ভিড়ে এভাবে তো হাঁটা যায় না। মন খুলে কথা বলা তো দূরের কথা, বুক ভরে নিশ্বাস নিতেও কষ্ট। বিষে বিষে ভরে গেছে শহর বন্দর।

খারেজের দক্ষিণমুখী দোকানটার ভেতর ঢুকতেই তেঁতুলতলির নরুল্লাহ চিত্কার করে ওঠে—আরে কবে আসলে, তা খবর না দিয়ে...

নরুল্লার কথা শুনে মাঝেরদিঘির পলটু-সফদর আতাবুর-বাজিবর যেন প্রাণ ফিরে পেল।

—যাক ভালোই হলো, আমাদের অতিথি তুমি গো!

—কীসের রে বল আগে...

—খানা আছে আজ গ্রামে, জানো না।

নরুল্লাহই বলল, আর বোলো না, জোবেদালী চাচার বড় ছেলে সেতাবুদ্দী বিয়ে করেছিল না...

—হ্যাঁ ঐ চরদিহি শ্মশানের ওদিকেই তো!

—জোবেদালী চাচা ছাড়িয়ে নিচ্ছে ছেলেকে...

—এটা আবার কেমন কথা!

—ছেলে তালাক দেবে না কিন্তু চাচা বলছে, ও মেয়েকে নিয়ে সংসার করলে সুকল্যাণ হবে না, মেয়ে নাকি বাঁজা...

—কিন্তু সেতাবুদ্দী তো পছন্দ করেই নাকি!

—আহা ও কথা বলে আমরা মাঝখান থেকে খারাপ হব কেন?

—তোরা খাওয়ার তালে আছিস এই তো!

­—হ্যাঁ ওটাই তো বড় কথা নয় কি!

ফুলজান ওখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তার বড্ডো রুচিতে বাঁধে। মনে মনে ভাবে, একটা সময় তো ওদের সঙ্গেই কত না অন্যায়-অকাম করেছে, তখন তো রুচির প্রশ্ন ওঠেনি। অথচ আজ ওদের ক্ষমা করতে পারল না। কিন্তু কেন এমন হলো?

উদার আকাশের নিচে এলোমেলো হাঁটতে মন্দ লাগে না। এমন হিমেল পরিবেশ আর কোথায় আছে। নিজ গ্রাম মানে তো মায়ের মতো, এমন মায়া ভরা ছায়া নিবিড় গ্রাম ছেড়ে আজ শুধু টাকার জন্য দূর শহরে পড়ে আছে। মনটা বড় ছায়া ছায়া হয়ে যায় কিন্তু একটা খটকা লাগে।

আরেকদিন সকালবেলা বাঁক রাস্তার কাছাকাছি আসতেই রঘুরনাথ বাগচির ছেলে ঘনার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।

—আরে কী সৌভাগ্য গো তুমি গাঁয়ে এসেছ...

—হ্যাঁ তা তো বেশ কয়েকদিন হলো।

—থাকব না গাঁয়ে আর থাকব না, আমাকে নিয়ে চল না বাবু...

অনেক পুরানো একটা নাম স্মরণে এসে গেল। ফুলজানের বাল্যকালের ডাকনামটা ঘনা বেশ যত্ন করেই তুলে রেখেছে। মনে মনে ভালো লেগে যায় ওকে। কতোকালের বন্ধুত্ব আজ ভুলতে বসেছে। কিন্তু সব ভোলা কি ভোলা যায়। যায় না বলেই হয়তো সে ভুলগুলোই সামনে চলে আসে সেলুলয়েড ফিতের মতো।

—তা শহরে গিয়ে কী হবে, গাঁয়ে কি মন বসছে না?

—বসবে কী করে বল গো! চারদিকে শুধু হাহাকার নেই নেই...

—শহরে কি আছে সবই, কিচ্ছু নেই...শুধুই মরীচিকা।

—ওসব বুঝি না বাবু, আমার একটা ব্যবস্থা করে দাও। তুমিই আমার ভরসা।

—বিয়ে করেছ নাকি গে!

—আর বিয়ে বল কী যে, নিজের পেটে ভাত নেই, দাদারা সবই একে একে ওপারে চলে গেল, আমি যেতে চাই না, যাব না।

—নথিনদা ভবেশদা নির্মলদা সবাই চলে গেছে! কী কথা বললে...

—না না ভাই আমি যাব না, আমি জন্মেছি এবং মরব এখানেই, তবুও যাব না কোনোদিন।

—ঘনা তোমার জন্য চেষ্টা করব, তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখ।

—যাক বাবু সত্যিই তুমি আমাকে বাঁচালে...

নাককাটি বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতেই দূরে সেই নাককাটি মন্দিরটা চোখে পড়ে। আরো জীর্ণ দশা এখন তার। তবে পরিবেশটা সে আগের মতো নেই। চারদিক অনেক পরিষ্কার এখন। গাছগাছালি সেভাবে চোখে পড়ে না। ফুলজানের বাল্যকালের দেখা ছবিগুলো কেমন মিউয়ে যাচ্ছে। কোথাও কেউ নেই সামলে-সুমলে রাখার। তার পায়ে যে গতির ঘণ্টা, সে তো তাকে নিরন্তর ছুটিয়ে নিয়ে যায়।

এখন ট্রেন ছুটছে, যথাসময়ে ঢাকায় পৌঁছেই দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করতে হবে। দূরের ছবি দেখে মন কেমন আকুলিবিকুলি করলেও মনকে সামলে রাখতে হবে। কোনো আবেগ আর কাজ করে না। গতবার ওর ব্যাগটা হারিয়ে গেছে, ভুলো মনে থাকা বড় অন্যায়। ঢাকায় যাওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার এমন হলেও গতবারেরটার কথা ভোলা যায় না। কারণ তার ব্যাগের মধ্যে ছিল আঁড় বাঁশি। হরেকৃষ্ণতলার মেলায় কেনা সেই বাঁশি। কত বছরের জমা গল্প ওর মধ্যে সঞ্চিত। বাল্যকালের কত স্মৃতি ওর সঙ্গে মিশেছিল!

ট্রেনে উঠেই কী যে হয়, পেছনের কথা খুব বেশি মনে পড়ে। তখন সে হয়ে যায় আরেক ফুলজান। নিজের ভেতরের ফুল কেন জানি জানের মধ্যে আটকে যায়, তারপরও ছুটতে হয়!

এখন এ মুহূর্তে বাল্যকাল যেন ছুটে ছুটে আসে ট্রেনের কামরায়। ট্রেনটা একসময় শৈশবের ফুলবাগিচা হয়ে ওঠে। আর তখন ফুলজান সে বাগিচার মালী হয়ে যায়।

[ঘোড়ামারা, রাজশাহী]

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন