শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ধ্যান চর্চা হোক ঘরে ঘরে

আপডেট : ২১ মে ২০২৪, ১৪:৪৮

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে ১০ থেকে ১২ বছর। অথচ, মানুষের জীবনে নিজেকে দেওয়ার মত সময় অনেকখানি কমে গেছে।

শুধু যে নিজেকে দেওয়ার সময়ই কমে গেছে তা নয়, অন্যকে অর্থাৎ পরিবার-পরিজন,আত্মীয় এবং বন্ধুদেরও সময় দেওয়ার বা সরাসরি কথা বলার, সাক্ষাৎ করার সময়ও যথারীতি কমে গেছে। এই সময়টা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে। চোখ আটকে থাকছে ডিভাইসে। শরীর স্থির, শুধু আঙুলের সঞ্চালন পর্দার উপরে। ইন্টারনেট সংযুক্ত ছোট কিংবা অপেক্ষাকৃত বড়পর্দায় ছড়ানো এবং সাজানো কনটেন্ট, রিল, ক্লিপ মানুষের দৃষ্টিকে নিয়ে যাচ্ছে কোথা থেকে কোথায়— তার কোন সীমারেখা নেই। কোন কিছু ভেবে বা কল্পনা করে মনে মনে চিত্র সাজাতে হচ্ছে না। সাউন্ড, মিউজিক ইফেক্ট দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সাজানো আছে সবকিছু। শুধু দেখবেন আর দেখবেন। যদি মন্তব্য কিছু করেন, তবে তা নির্মাতার অতিরিক্ত প্রাপ্তি। একটা পর্যায়ের পর, আমি আপনি যত দেখব ততই পকেট ভারি হবে নির্মাতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মালিকপক্ষের। আপনি যা দেখতে পছন্দ করেন বা বেশি বেশি দেখেন সেই বিষয়গুলো ঘুরেফিরে আপনার ডিভাইসে উপস্থাপন করা হবে বারবার। সেই বিষয়গুলো হতে পারে প্রকৃতি থেকে পর্নোগ্রাফি পর্যন্ত যে কোনো কিছু।

স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশ সপ্তাহে ১৮ ঘণ্টা বা তারও অধিক সময় ব্যয় করে থাকে এক অর্থে অপ্রয়োজনীয় ভার্চুয়াল জগতে। একটি থেকে আরেকটি— এরকম  চলতে চলতে কখন যে অনেকখানি সময় পেরিয়ে যায় তা ব্যবহারকারী নিজেও ঠাওর করে উঠতে পারে না।  অনেক কিছু দেখা হয়, কিন্তু আবছা চিত্র ছাড়া তেমন কিছুই মনে থাকে না। আর সে সবকিছুতে সত্য-মিথ্যার কোন মাপকাঠি নেই। কাজেই, সেখান থেকে জ্ঞানার্জনের ইচ্ছা বা উপায় কোনটিই ব্যবহারকারীর থাকে না বললেই চলে। আর যারা কিছু জানবার বা বুঝবার প্রত্যয় নিয়ে ব্যবহার করেন, তাদের কথা ভিন্ন। তবে তাদের মধ্যেও অনেকে কাজের বিষয় থেকে অকাজের বিষয় চলে যান, সময় হয়ে যায় অনেকাংশেই নষ্ট সময়।

দীর্ঘসময় এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনোদনের আশায় কাটানোর পরিণাম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের উপরেই বিরক্তির উদ্রেগ হওয়া। সময়ের সাথে প্রকৃত কাজের পিছিয়ে যাওয়ার কারণে বিরক্তি, অথচ কাউকে দোষারোপ করবার কিছু নেই। ঘুরেফিরে নিজের প্রতি এই অসন্তোষ প্রকাশিত হয়ে পড়ে নিজের সবকিছুর উপর। আর ক্রমবর্ধমান এক অস্থিরতা নিজের ভেতর থেকে উঠে আসে বাইরের কাজে এবং কথায়।

ইউটিউব কর্তৃপক্ষের একটি জরিপে দেখা গেছে, তুলনামূলক ভাবে অধিকতর জনপ্রিয় বা প্রদর্শিত হয় সেইসব রিল বা ভিডিও কনটেন্টগুলেঅ যেগুলোর সময়কাল মাত্র ৩০ সেকেন্ড বা এমন অল্প সময়ের। মানুষের মনোযোগ দেওয়ার সময়, সেই সাথে মনঃ সংযোগ করবার ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে যাচ্ছে অনেকখানি। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষ একটি বিষয়ের উপর একটানা ৩৫ মিনিটের বেশি মনঃসংযোগ ধরে রাখতে পারে না। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অধিক সময় দেওয়া মানুষের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা আরো অনেক স্বল্প হয়ে এসেছে। আরেক রকম আসক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মাদকাসক্তির চেয়ে খুব কম ক্ষতিকারক নয়। কোনরকম বাস্তব কাজের প্রয়োজন ছাড়াই মানুষের ইন্টারনেট সংযোগ, ওয়াইফাই অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। পকেটে খাবার টাকা না থাকলেও স্মার্টফোনে ডেটা থাকতে হবে। ডেটা খরচ করে বিনোদনের নামে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা মনকে প্রশান্ত না করে আরো অশান্ত করে তুলছে। ফলে অনেক নেতিবাচক প্রভাবের সাথে মানুষের মধ্যে ADHD নামক একটি মনোরোগের লক্ষণ অধিকারে প্রকাশ পাচ্ছে। ADHD এর পূর্ণরূপ Attention Deficit Hyperactive Disorder। সহজ করে বললে মনোযোগের জায়গায় ঘাটতি, বিক্ষিপ্ত মন অনেক সময় হেলায় নষ্ট করে অসময়ে কাজের বেলায় গিয়ে অতিমাত্রায় কর্ম সম্পাদনের চেষ্টায় নিজের এবং অন্যের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। মজার বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কয়েকজন তরুণ-তরুণীর সাথে কথা বলে জানা যায়, যে তারা ADHD সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কেউ কেউ আবার নিজের মধ্যে এর লক্ষণ খুঁজে পায় এবং এই কারণে যে তাদের সফলতা বা প্রাপ্তির জায়গায় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে সেটিও উপলব্ধি করে। সেই সাথে অতিরিক্ত সময় ভার্চুয়াল জগতে ব্যয় করা যে এর অন্যতম একটি কারণ, সে কথাও স্বীকার করে। তারপরও এই আসক্তি জীবনের আরও অধিক সময় গ্রাসে।

এখন খুবই স্বাভাবিক প্রশ্ন, সমাধান বা পরিত্রাণের উপায় কি? পরিত্রাণের নিশ্চয়ই অনেক উপায় এবং পথ আছে। প্রত্যেকের জন্য তার নিজস্ব উপায় থাকতে পারে যা ব্যক্তি নিজেই খুঁজে নেয় বা নিতে পারে। একটি প্রাথমিক উপায় এর কথা দার্শনিক সক্রেটিস বলে গেছেন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে— “নিজেকে জানো”। নিজেকে জানার জন্য তো নিজের ভেতরে ডুব দিতে হবে, আর সেই জন্য একটি উত্তম প্রক্রিয়া হচ্ছে মেডিটেশন বা ধ্যান।
মেডিটেশন বা ধ্যান বলতে আমরা সাধারণ মানুষেরা উচ্চস্তরের কোন সাধনাকে বুঝে থাকি। মহাপুরুষেরা সাধনা করে থাকেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন থেকেছেন। গৌতম বুদ্ধ অশ্বথ বৃক্ষের নিচে ধ্যানরত থাকতেন। মুনি-ঋষি সাধকেরা করে থাকে, এটি সাধারণ মানুষের জন্য নয়— এমনটি ভাবা হচ্ছে অনেককাল ধরেই। বর্তমান কালে ধ্যানকে সর্বজনীন পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ধ্যানের উপকারিতার কথা চিকিৎসকরাও বলেছেন এবং কোন কোন রোগীকে ব্যবস্থাপত্রেও লিখেছেন নিয়মিত ধ্যান চর্চা করার কথা। আজ থেকে ৫০ বছর আগে অনেক কিছুই মানুষের কাছে একরকম কল্পনাতীত ছিল, যা আজকের দিনে প্রায় সর্বজনীন হয়ে গেছে। যেমন মুঠোফোন বা সেল ফোন এবং এর ব্যবহার। তেমনিভাবে ধ্যান সার্বজনীন হয়ে গেলে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই কিছু। লাভ না বলে উপকার বলাই যথার্থ হবে, সেই উপকার ব্যক্তির নিজের, একই সাথে সমাজের বা রাষ্ট্রের। অন্য অনেক কিছুই সার্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছানো ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের জন্য অনেক ব্যয় সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মেডিটেশন এর জন্য সেরকম কিছু নয়, শুধু নিজের জন্য কিছুটা সময় নিজেকে দেওয়া, শান্ত হয়ে নিজের ভাবনার গভীরে নিজেই নিমগ্ন হওয়াই যথেষ্ট।

ধ্যান শব্দটি (বিশেষ্য পদ) এসেছে সংস্কৃত শব্দ  “ধ্যা” থেকে, যার অর্থ মনো নিবন্ধকরণ, ধ্যানে নিমজ্জন, গভীর চিন্তা একাগ্রভাবে মনন ও স্মরণ। ধ্যান হলো এক ধরণের অনুশীলন যেখানে কোনো ব্যক্তি কিছু কৌশল যেমন মননশীলতা বা কোনো নির্দিষ্ট বিষয় চিন্তা বা কাজের প্রতি মনোনিবন্ধকরণের মাধ্যমে মনোযোগ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং স্বচ্ছ মানসিক ও শান্তিপূর্ণ আবেগী, স্থিতিশীল অবস্থা অর্জন করতে পারে। ঐতিহ্যভেদে এর কৌশলে নানারূপ পরিবর্তন রয়েছে।

২১ মে  বিশ্ব মেডিটেশন দিবস । ২০২১ সাল থেকে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাংলাদেশে  এই দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এই সংঘটি বাংলাদেশে ধ্যানচর্চাকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তিন দশক ধরে কাজ করে চলেছে। এছাড়াও কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন অনেকগুলো সেবামূলক খাতে কাজ করে থাকে। গত ২৩ বছরে এই সংঘ থেকে ২৬ লাখ ব্যাগ রক্ত এবং রক্ত উপাদান সরবরাহ করা হয়েছে। সারাদেশে এই ফাউন্ডেশনের ২৫০টিরও অধিক শাখা রয়েছে এবং বহির্বিশ্বে রয়েছে আরও ১৮টি শাখা। দেশের প্রতিটি শাখায় প্রতি শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সাদাকায়ন নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যার মূল বিষয় সমবেতভাবে ধ্যানচর্চা। ধ্যানের প্রক্রিয়ার মাঝে শ্বাসযন্ত্র ভরে দম নেওয়া এবং শূন্য করে দম ছাড়ার যে অনুশীলন, তা শরীর মনকে সতেজ করে তোলে আর শিথিলায়ন (Relaxation) প্রক্রিয়ায় শরীর সকল অবসাদ কাটিয়ে উঠে, মন চঞ্চলতা দূর করে অনাবিল প্রশান্তির পরশ পায়।

বিগত বছরের মতো এবারও মেডিটেশন দিবসের প্রতিপাদ্য—  “ভালো মানুষ, ভালো দেশ, স্বর্গভূমি বাংলাদেশ”। এর থেকে সুন্দর চাওয়া আর কি হতে পারে !

ইত্তেফাক/এএইচপি