সমাজের বিভিন্ন গোঁড়ামি ও কুসংস্কারকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তার প্রহসনমূলক নাটক ‘একেই কি বলে সভ্যতা’য় সেগুলো ব্যাপক হাস্যরসের জোগান দিয়েছে। সামাজিক অসংগতিসহ মানুষের মধ্যকার যে অবক্ষয় রয়েছে সেগুলো উপস্থাপন করেছেন নিখুঁতভাবে। একই কায়দায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের কঙ্কালসার অবস্থা যেন তুলে ধরলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।
গত পরশু যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সিরিজ হারের পরে সংবাদ সম্মেলনে যেভাবে কথা বলেছেন তাতে সেটিকে প্রহসনই মনে হয়েছে। টি-টোয়েন্টিতে শততম হারের পরে সাকিব যেন হাস্যরসের জোগান দিতে এসেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে! টাইগারদের লজ্জাজনক পারফরম্যান্সের পরে পুরো জাতি যেখানে নির্বাক, সেখানে সাকিবের প্রহসনমূলক কথা হাস্যরস ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি। মধুসূদন দত্তের নাটকটিতে মদখোর স্বামীকে নিয়ে স্ত্রী হরকামিনী বলেছিলেন, ‘এমন স্বামী থাকলেই বা কি, আর না থাকলেই বা কি!’ বাংলাদেশের খেলা দেখে ভক্তরা এখন সামাজিকমাধ্যমে অনেকটা এমনই বলছেন, এমন ক্রিকেট খেলা থাকলেই বা কি, আর না থাকলেই বা কি!
লাল-সবুজের জার্সিতে দেশের প্রতিনিধি হয়ে একজন ক্রিকেটার মাঠে নামেন। যখন তারা জয় তুলে নেন, তখন গর্বে বুক ভরে ওঠে কোটি কোটি বাঙালির। রাস্তায় স্লোগান বের হয়, ঘরে-মাঠে-ঘাটে পতাকা ওড়ে। হারলে হৃদয়ে হয় রক্তক্ষরণ। আর সেই হারের পরে যদি ক্রিকেটারদের অদ্ভুত কথাবার্তার সাক্ষী হতে হয়, তাহলে তো স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। জিম্বাবুয়ের সিরিজের আগে সাকিব বলেছিলেন, এই সিরিজ খেলে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সিরিজেও রয়েছে গা ছাড়া ভাব। ফল হিসেবে পেছনে থাকা দলটির বিপক্ষে সিরিজ হারতে হয়েছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও হারতে হয়েছে একটি ম্যাচ।
এমন হারের পরে সাকিব বলেছেন, ‘হারাটা আমাদের জন্য হতাশার। যে কোনো ম্যাচ হারাটাই হতাশার। আমার ধারণা, কেউই আশা করেনি যে, দুইটা ম্যাচ হেরে যাব। সেখান থেকে অনেক বেশি হতাশা আমাদের জন্য।’ এমন হারের পেছনে কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘এটা তো আমি জানি না। আমি জানলে তো দলকে বলতাম। দল ফলাফল অন্যরকম করত।’
কোনো কিছু সমাধানের আগে সমস্যাটা জানতে হয়। কিন্তু এমন অভিজ্ঞ একজন ক্রিকেটার সমস্যাটাই জানতে পারছেন না। তিনি দলের প্রতিনিধি হয়ে সেই কথাটুকুই নির্দিষ্ট করে বলতে পারলেন না। হতে পারে সাকিব সত্যিই জানেন না দলের সমস্যা কোথায়। এমনটা হলে বড় ধরনের শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা যাচ্ছে টপ অর্ডারের ব্যাটিং নিয়ে। বিশেষ করে ওপেনিং। এই বিষয়েও সাকিব একই কথা বলেছেন, ‘আমি বলতে পারব না। এটার উত্তর আমার কাছে নাই।’ তবে মাগুরা-১ আসনের এই সংসদ সদস্য স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ ভালো ক্রিকেট খেলতে পারছে না।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট নিয়ে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বলেছেন, ‘টি-টোয়েন্টিতে সব দলই সমান। আমি ওয়েস্ট ইন্ডিজ-এ দল ও নেপালের খেলা দেখেছি তারা ভালো খেলেছে। আয়ারল্যান্ড-স্কটল্যান্ড ভালো খেলছে। পাকিস্তানের মতো দল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হেরেছে।’ তবে বাংলাদেশ হার বাদে চমক জাগানোর মতো কিছুই করতে পারছে না। র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা দলের বিপক্ষে হারের পাশাপাশি এখন পিছিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে হারছে বাংলাদেশ।
এ কারণেই এই দলকে নিয়ে খুব বেশি আশা করতে নিষেধ করেছিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের ক্রিকেট নিয়ে সাকিব বলেছেন, ‘দলগত খেলা এটি। সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হবে। কাউকে দোষ দিতে চাই না। টি-টোয়েন্টিতে আসলে সবকিছুতে ভালো করতে হবে—ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং। এখানে ছোট দল বড় দল নেই। গত ২ ম্যাচ এটাই প্রমাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।’
যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রমাণ করতে পারলেও দেশের ক্রীড়াবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েও বাংলাদেশ কাজের কাজটি করতে পারেনি। উলটো সাকিব কম সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেকে কেনিয়ার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তবে সকলেই আশা করেন টাইগার বাহিনী ঘুরে দাঁড়াক, ২২ গজে ভালো কিছু করুক।
