মো. আমিরুজ্জামান
সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা
আধুনিকতার ছোঁয়ায় কলের গান এখন নেই বললেই চলে। আর চোখেই পড়ে না এক সময়ের জনপ্রিয় এই কলের গান। আগের দিনে প্রায় অভিজাত পরিবারে গান শোনার মাধ্যম ছিল কলের গান। সেই কলের গান হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। ঠাঁই হয়েছে জাদুঘরের চৌহদ্দিতে। ১৮৭৮ সালের কথা। টমাস এডিসন আবিষ্কার করলেন ফোনোগ্রাফ। তখন থেকেই সংগীত দরবারের ঘেরাটোপ থেকে বেড়িয়ে চলে এলো সাধারণ মানুষের ঘরে। আর আহ্লাদে আটখানা হয়ে এর নাম সাধারণরাই দিলো কলের গান। নতুন প্রজম্ম থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে গান শোনে স্মার্ট ফোনে, আইফোনে, ট্যাবে, কম্পিউটার আর এমপি থ্রি প্লেয়ারে। তাঁরা কিভাবে জানবে সেই আমলের কলের গানের গল্পকথা।
যতদূর জানা যায়, শব্দ সংরক্ষণের জনক টমাস এডিসন ১৪০ বছর আগে কাঠের বাক্সের ওপর চোঙ্গা লাগানো এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করলেন, সেই বাক্সের মধ্যে গোলাকৃতির এক বস্তুর ওপরে চাকতির মধ্যে পিন লাগিয়ে ঘোরালে শব্দ হয়। নাম দিলেন ফোনোগ্রাফ। তারপর মাটির রেকর্ড থেকে প্লাস্টিকের সুতোয় ঘূর্ণন রেকর্ড। এডিসনের পোষা প্রিয় কুকুরকে গ্রামোফোনের সেই চোঙ্গার সামনে বসিয়ে মনোগ্রাম করে নামকরণ করা হলো—‘হিজ মাস্টার্স ভয়েজ’ বা এইচএমভি রেকর্ড। ১০৯৮ সালে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠা পেল গ্রামোফোন কোম্পানি। কলকাতার বালিয়াঘাটায় এশিয়ার প্রথম ১৯০৮ সালের ১৯ জুন কলের গানের কারখানা স্থাপিত হয়। সেখানে গ্রামোফোনের খুচরা যন্ত্রাংশও তৈরি হতো।
সংগীতপিপাসুদের জন্য রবীন্দ্র, নজরুল, বাংলা গীত, নাট্য, কৌতুক সবই রেকর্ড করা হতো। এমনকি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠের গানও রেকর্ড করা হয়েছিল ৭৮ আরপিএম রেকর্ডে। বনেদি বাবু বা সৈয়দ, খন্দকারদের বাড়ির বৈঠকখানায় আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে রাখা হতো কলের গান। বিজ্ঞানের আশির্বাদ ও আকাশ সংস্কৃতির ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে কলের গান। কালের বিবর্তনে গ্রামোফোনের পাশাপাশি এলো আরপিএম রেকর্ড প্লেয়ার (ছোট রেকর্ড)। তারপর এলো অটো রেকর্ড প্লেয়ার। চলতো ব্যাটারি আর বিদ্যুতে। সেইসঙ্গে বড় ফিতার স্পুল রেকর্ডার। যাকে বলা হতো টেপ রেকর্ডার।
আশি থেকে নব্বই দশক দাপালো ছোট ফিতার ক্যাসেট রেকর্ডার। এ সময় চলে এলো ভিডিও ক্যাসেট। তারপরের ইতিহাস ডিজিটাল। একুশ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল ক্যাসেট প্লেয়ার। খুব দ্রুতই সুপারসনির ডিজিটাল ধাক্কায় হারিয়ে গেল কালের অতলে। এলো কম্প্যাক্ট ডিস্ক (সিডি)। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এলো ডিজিটাল ভিডিও ডিস্ক (ডিভিডি)। গান, স্থিরছবি, চলমান ছবি সবই সংরক্ষণের সুবিধা। এবার বিবর্তনের ধারায় ছোট্ট বস্তুটিও বোঝা হয়ে গেল। হাতের মুঠোয় এলো আরো ছোট পেনড্রাইভ। সেটা চালাতে লাগে কম্পিউটার। ঝামেলা মনে হলো। এত সময় কী আছে আর মানুষের। বিজ্ঞান এবার সব ঢুকিয়ে দিলো হাতের মুঠোফোনে। এখন হাতের মুঠোয় বিশ্ব বাতায়ন। অন্তর্জালেই সবকিছু। নাচ, গান, কবিতা, উপন্যাস, চারু-কারু, তথ্য-উপাত্ত সবই আছে স্মার্টফোনে। চাইলে মুহূর্তেই গুগল তা আপনাকে দিতে বাধ্য থাকবে।
