'উড়ালসড়কের নিচের চিত্র বদলাতে প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের সাহসী উদ্যোগ'

স্থপতি অধ্যাপক ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদ একসময় বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি সম্পন্ন করে যোগ দেন দ্য ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকার স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড প্ল্যানিংয়ে। সেখানেই অধ্যাপনা করছেন দুই দশকের বেশি সময় ধরে। বাংলাদেশেও তিনি সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজম নামের একটি স্থাপত্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক, যারা সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার উড়ালপথের নিচের জায়গাগুলোর কার্যকরী ব্যবহার নিয়ে রূপকল্প তৈরি করেছে। ইত্তেফাক ডিজিটাল-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় ড. আদনান এ ব্যাপারে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন

 

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৪, ১৭:২৪

ঢাকার যানজট নিরসনের মাধ্যমে সড়ককে গতিশীল করতে গত দুই দশকে ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটিসহ নানারকম উড়ালপথ নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের অবকাঠামোর নিচের জায়গাগুলোর ব্যবহার নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি। ফলে ঢাকার বিভিন্ন উড়ালপথের নিচে অব্যবহার ও অপব্যবহারে পড়ে আছে অন্তত ২০০ একর জমি। যার বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাবের ফলে আমরা আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অথচ সৃজনশীল ও জনবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে এই মূল্যবান নগর-জমিগুলোকে গণপরিসরে রূপান্তর করা সম্ভব।

আমরা ঢাকার বিভিন্ন ফ্লাইওভার-সংলগ্ন এলাকার স্থানীয়দের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক জরিপ করে দেখেছি, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদা দিলে উড়ালপথের নিচে দোকান স্থাপন করা যায়। রাতে মাদক কেনাবেচাও হয় প্রকাশ্যে। আবার যে অংশটি ভাগাড় বা ময়লা ফেলার জায়গায় পরিণত হয়েছে, তা চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়ায়। অস্থায়ী কাঁচাবাজারের নোংরা-আবর্জনাও চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। অল্পকিছু জায়গায় পথশিশুরা খেলাধুলা করে। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি কম থাকায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও হয়। এছাড়া কোনো সংগঠন বা সংস্থার উদ্যোগে কখনো কখনো গাছপালা লাগানোর চেষ্টা করলেও তা দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। সর্বোপরি ফাঁকা পড়ে আছে অঢেল জায়গা, যা কোনো কাজে আসছে না। ঢাকার মতো উচ্চ জনঘনত্বের শহরে এটি বিরাট অপচয়।

অন্যদিকে দেখুন, পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন ফ্লাইওভারের নিচে হাঁটাচলার পথ ও সাইকেলের লেন, নগর-কৃষি, বাগান, বনায়ন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিছু জায়গায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শরীরচর্চা কেন্দ্র, লাইব্রেরি এবং পথনাটক বা শিল্পকর্ম প্রদর্শনের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নিম্নআয়ের মানুষেরা সম্পৃক্ত হচ্ছেন। ভারতের মুম্বাইয়েও এমন উদাহরণ রয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, ঢাকার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে জনকল্যাণমুখী ও জনস্বাস্থ্যবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে উড়ালপথের নিচের মূল্যবান নগর-জমিকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। ঢালাওভাবে একরৈখিক পরিকল্পনা না করে স্থানীয় এলাকার আর্থসামাজিক চরিত্র ও বর্তমান ভূমি-ব্যবহারের ধরন বুঝে উড়ালপথের নিচের জায়গাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। নগরের বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি ও পথচারীবান্ধব নগরায়ণ ত্বরান্বিত করতে উড়ালপথের নিচে পথচারীদের জন্য অবিচ্ছিন্ন হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং মানসম্মত পাবলিক টয়লেটও স্থাপন করা যেতে পারে। কোথাও কোথাও নিচু অংশে গাড়ি পার্কিং ও পুলিশ বক্স বসানো যেতে পারে। যেখানে উচ্চতা বেশি, সেখানে স্কাইওয়াক হতে পারে। এছাড়া সহজেই স্থাপন করা যেতে পারে পথশিশুদের নিরাপদ আবাসস্থল, আর তাদের অবৈতনিক বিদ্যালয়। হতে পারে একটি ছোট পরিসরের ক্রিকেট একাডেমি, যেখান থেকে পথশিশুরা হয়ে উঠতে পারে আগামীদিনের তারকা। কোথাও তৈরি করা যেতে পারে গণপরিবহনের যাত্রীদের জন্য মানসম্মত অপেক্ষাগার। জনসাধারণের জন্য পাঠাগার কিংবা ব্যায়ামাগার থাকতে পারে অন্যকোনো অংশে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পরিকল্পিত জায়গা নির্ধারণ ও ছিন্নমূল মানুষের সাময়িক আশ্রয়স্থল তৈরিরও সুযোগ রয়েছে। উড়ালসড়কের মতো অবকাঠামোর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা, এজন্য বড় অঙ্কের অর্থের বা প্রকল্পের প্রয়োজন নেই।

উড়ালসড়ক এখন বাংলাদেশের নগরায়ণের বাস্তবতা। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর শুধু ওপরের অংশটিই আমরা যানবাহন চলাচলে একমাত্রিকভাবে ব্যবহার করছি, যা আমাদের মূল্যবান নগর-জমির অপচয়। নতুন প্রজন্মের উদ্যমী ও সাহসী নগর নীতিমালা আর সৃষ্টিশীল পরিকল্পনার মাধ্যমে উড়ালসড়ককে বাসযোগ্য নগরীর সবুজ অবকাঠামোয় রূপান্তর করা সম্ভব।

আরও পড়ুন:

ইত্তেফাক/এসটিএম