শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিত্র বদলে দিচ্ছে এলজিইডির গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৪, ২০:১৭

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের ‘শত কোটি টাকা উন্নয়ন ব্যয়ে সমুদ্র উপকূলের এক একটি অজোপাড়াগাঁও এখন যেন এক একটি শহর। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত গ্রাম হবে শহর’ এটি এখন দৃশ্যমান উপকূলীয় জনপদ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য চাষে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল হয়েছে।

কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র খামারি, মৎস্য চাষি তাদের কষ্টার্জিত উৎপাদন স্বল্প সময়ের মধ্যে বাজারজাত করে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে। এক কথায় স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে উপকূলের গ্রামীণ এলাকায় এলজিইডি টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর সার্বিক কার্যক্রমের ফলে দেশের আর্থসামাজিক চিত্র বদলে যাচ্ছে। মানুষ স্বল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে একস্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে পারছেন। বিশ্বব্যাংকের ২০১৬ সালে গ্রামীণ যোগাযোগ সূচক শীর্ষক এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ৮৪ শতাংশ মানুষ দুই কিলোমিটারের মধ্যে সারাবছর চলাচলের উপযোগী পাকা সড়ক ব্যবহারের সুযোগ পায়। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) সূচকেও ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক নেটওয়ার্ক নিশ্চিতকরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে গ্রামীণ যোগাযোগ সূচকের পরিমাণ শতকরা ৯০ ভাগে উন্নীত করা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. আলি আকতার হোসেন বলেন, এলজিইডির মূল লক্ষ্য পল্লি, নগর ও ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করা। আজ এলজিইডির গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের পরিমাণ প্রায় তিন লক্ষ বাহাত্তর হাজার কিলোমিটার, যার মধ্যে পাকা সড়কের পরিমাণ এক লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার কিলোমিটার। তিনি আরও বলেন, এলজিইডি গত অক্টোবর ২০২৩ থেকে মে ২০২৪ পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন করেছে ৩,২৮৭ কিলোমিটার এবং সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে ১৪০০০ হাজার মিটার। তিনি মন্তব্য করেন, এলজিইডি দেশজুড়ে পল্লি, নগর ও পানিসম্পদ সেক্টরে উন্নয়নের শক্ত ভিত রচনা করে চলেছে। 

প্রধান প্রকৌশলী আরো বলেন, এলজিইডি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে আস্থার সঙ্গে কাজ করছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাঙামাটিতে শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা অতীতে কোনো সরকার করতে পারেনি।

দেশের উন্নয়নের মতো চলতি অর্থবছরে কুমিল্লার ১৬টি উপজেলার নতুন করে রাস্তা-ঘাট, সেতু, কালভার্ট, ড্রেন, সড়ক বা জলাশয়ের পাশে থাকা জলাশয় থেকে সড়ক নিরাপত্তার জন্য রিটেইনিং দেয়ালসহ বিভিন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কারে প্রায় ১৩০২ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। দাউদকান্দি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভূমি অফিস, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো নির্মাণ, পুকুর, খাল খনন করা হয়েছে। কুমিল্লায় এলজিইডির অধীনে ১০ হাজার ১০৪ কিলোমিটার কাঁচা-পাকা সড়ক রয়েছে। জেলার মোট ১০ হাজার ১০৪ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে বেশীর ভাগ সড়কই পাকা। জেলার গ্রামীণ ভৌত অবকাঠামো বিনির্মাণে সরকারের দেওয়া বরাদ্দে পুরো জেলাজুড়ে চলছে উন্নয়নের চোয়া।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায় গত ৮ বছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৪শ'৩০ কিলোমিটার বিভিন্ন ধরনের নতুন পাকা সড়ক নির্মাণ করেছে। এতে ব্যায় হয়েছে ২শ'৫০ কোটি টাকা। এসব সড়ক নির্মাণের কারণে উপজেলার গ্রাম জনপদে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ যেমন দুর হয়েছে। তেমনি মানুষের সহজ যাতায়েত নিশ্চিত সহ গ্রামে মিলছে শহরের সুযোগ সুবিধা। গ্রামীণ অর্থনীতি হয়েছে গতিশীল শক্তিশালী। উল্লাপাড়া উপজেলার কয়ড়া ইউনিয়নের জঙ্গল খামার। বৃহৎ এই গ্রামটির সিংহভাগ ভাগ মানুষ কৃষি পেশার সাথে জড়িত। ফসল চাষাবাদ আর গো-খামার করে জীবিকা নিবার্য করে বেশিরভাগ মানুষ। এই গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে। গ্রামটির চলাচলের একমাত্র মাটির সড়কটি যুগের পর যুগ ধরে বিপর্যস্ত ছিল। দুই পাশে ভেঙ্গে সরু হালটে পরিণত হয়েছিল। এমন অবস্থায় যানবাহন চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সামান্য ঝর-বৃষ্টিতে পুরো সড়কে কাঁদা হয়ে যেত। দীর্ঘদিন এমন সমস্যার কারণে গ্রামের কৃষকরা কোন মালামাল আনতে পারতো তা। ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেতে কষ্ট পোহাতো। চলতি বছর সড়টি পাকা করা হয়েছে। এত দূর হয়েছে গ্রামটির দুই হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের সব দুভোর্গের। এখন চলাচল করছে সব ধরনের যানবাহন।

এই গ্রামের দুগ্ধ ব্যবসায়ী মো. মতিন মিয়া জানান, আমি প্রতিদিন গ্রামের খামারীদের কয়েক মন গরুর দুধ সংগ্রহ করে মিলে বিক্রি করি। রাস্তাটি এমন খারাপ ছিল যে দুধ সংগ্রহ করে তা ভ্যান ঠেলে নিয়ে যাওয়া কষ্ট কর ছিল। এখন সড়কটি পাঁকা করায় খুব ভাল হয়েছে।

গ্রামের কৃষক ছলিমউদ্দিন জানান, সড়কটি খারাপ থাকায় আমারা মাঠের ফসল বাড়িতে আনতে পারতাম না। ফসল বিক্রির জন্য হাট-বাজারে নিতে পারতাম না। সার- বীজ আনতে পারতাম না। এখন পাকা হবার পর আমাদের সেই দুঃখ দুর হইছে। আমরা সব সময় মালামাল নিয়ে আসা যাওয়া করতে পারতেছি। রাস্তা পাকা হওয়ায় গ্রামের বাজারেই সব ধরনের পণ্য কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। দিন রাত গ্রাম থেকে যানবাহনে চড়ে দেশের যে কোন প্রান্তে আসা যাওয়া যাচ্ছে। ছেলে মেয়েরা শহরের স্কুল কলেজে আসা যাওয়া করতে পারছে। এমন সুবিধার কথা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ কোনদিন চিন্তাও করতে পারতো না। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়নের কারণে এখন শক্তিশালী ও গতিশীল হয়েছে এ উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতি।

সুনামগঞ্জ উপজেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার দিরাই মোড়ে অটোরিকশা চালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এ সড়কটি ভাঙাচুরা, খানাখন্দকে ভরা থাকায় উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগে ছিল অনেক কঠিন। অনেকসময় লাগতো, খচর বেশি পড়তো। প্রয়োজনে সময় মতো নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারতাম না। হাওর থেকে ধান তুলতে কৃষকদের অনেক কষ্ট হতো। এলজিইডি এ সড়ক নির্মাণের পর এখন সহজে ধান আনতে পারি, যাতায়াত করতে পারি।

নেত্রকোনার জেলার কলমাকান্দ উপজেলা ঘোড়ার গাড়িচালক মো. রমজান আলী জানান, এ সড়ক খারাপ থাকায় চলতে অনেক কষ্ট হতো। সড়ক ভালো হওয়ায় অনেক উপকার হয়েছে। আমরা আগে কাঠের চাকায় চলতাম এখন টায়ারের চাকায় চলি। আগে আমাদের আধা ঘণ্টা লাগতো এখন ২০ মিনিটে রাস্তা অতিক্রম করতে পারি।

কলমাকান্দা উপজেলার পাঁচগাও সীমান্তবর্তী এলাকার সুফিয়া বেগম জানালেন, রাস্তা খারাপ থেকে অনেক গর্ভবর্তী মাকে সন্তান প্রসবের জন্য কলমাকান্দা হাসপাতালে নেওয়া যায়নি। প্রায় ১২-১৪ মা রাস্তায় প্রাণ হারিয়েছে। রাস্তা হওয়ার পর আর কোনো গর্ভবর্তী মায়ের মৃত্যু হয়নি। এখন সহজেই কলমাকান্দা হাসপাতালে রুগী নিয়ে যাওয়া যায়।

টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার মহেশান ইউনিয়ন সংলগ্ন সেতু পারাপারের সময় কথা হচ্ছিল ট্রাক ড্রাইভার আলীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, সেতুটি নির্মাণের ফলে ১৫ কিলোমিটার রাস্তা কমে গেছে। জ্বালানি খরচও কমেছে এবং যাতায়াত সহজ হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর ইউনিয়নের সংলগ্ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রোমিও জানান, বার্ষায় মাটির বৃষ্টিপাতের কারণে মাটির রাস্তা কাদা ভরে থাকতো ফলে ছেলে- মেয়েরা স্কুলে আসতে পারতো না। রাস্তা নির্মাণের ফলে স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার বেড়ে গেছে এবং ঝরে পড়ার হারও কমে গেছে।

কেবল রাস্তা-ঘাট বা সেতু-কালভার্ট নয় এলজিইডি উৎপাদিত পণ্য পরিবহন ও বিপণনের জন্য নির্মাণ করছে গ্রাথসেন্টার বা হাটবাজার সংযুক্ত সড়ক ও বাজার অবকাঠামো। রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার কালিগঞ্জ হাটের পাইকারী ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম জানালেন, এ হাট শুক্রবার ও মঙ্গলবার সপ্তাহে দুদিন। এ দুদিনে দুই কোটি টাকার ব্যবসা হয়। রাস্তা-ঘাট ভালো হওয়ায় অনেক ভেতর থেকে পণ্য আসে। সেই পণ্য খুব সহজেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়।

 

ইত্তেফাক/এনএ