ইভাঙ্কা :সাদা বলেই কি কাদামুক্ত?

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৯, ২১:৫০

আনুশে হোসেন

 হোক সেটা বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলে অথবা তার বাবার প্রশাসনের অভ্যন্তরে, আমরা ইভাঙ্কা ট্রাম্পের আকাশচুম্বী উত্থানের দিকে বিস্ময়ের সঙ্গে চেয়ে থাকতে পারি। শত হলেও ইভাঙ্কার বাবা ট্রাম্প তাঁর কেবিনেটে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা এবং পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির জোয়ার এনে কুখ্যাত হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ট্রাম্পদের বেলায় এ সপ্তাহে যা ঘটল, তা আরো হতাশাজনক।

জাপানের ওসাকায় জি-২০ সম্মেলনের সময়, দক্ষিণ কোরিয়ায় এবং দুই কোরীয় সীমান্তের বেসামরিক এলাকায় মিটিংয়ের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের অভাব বড়ো বেশি চোখে পড়েছে। আর এদের পরিবর্তে কিনা নেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট-কন্যাকে! যে কাজের দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের কন্যা নিয়েছেন, বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় #IvankaIsASecurityThreat এবং  #UnwantedIvanka হ্যাশট্যাগে ভাইরাল হয়েছে। 

ফরাসি সরকারের অনলাইনে পোস্ট করা একটা বিব্রতকর ভিডিওতে দেখা যায়, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো এবং ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ডের প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্ডের মধ্যে আলোচনায় ইভাঙ্কা নিজেও ঢুকতে চেষ্টা করছেন। এটা খুব সূক্ষ্ম কোনো কূটনৈতিক অসম্মানের বিষয় ছিল না। রিপাবলিকান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোরতেজ টুইটারে বলেছেন, ‘এটি অনেকের কাছেই ধাক্কা লাগার মতো বিষয়। কিন্তু মূল কথা হলো, কারো কন্যা হওয়া তো পেশাগত যোগ্যতা হতে পারে না। এটি আমাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে আহত করে, বিশেষ করে যখন প্রেসিডেন্ট নিজে বিষয়টি হস্তক্ষেপ করেন।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ এসব গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা ও উদ্বেগকে আমলেই নেয় না। বরং ‘ঘৃণাকারীদের এসব অভিযোগ নিরেট নৈরাশ্যকর’ বলে অখ্যায়িত করে। এমনকি বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রধানদের সঙ্গে ইভাঙ্কার এক টেবিলে বসাটাকে নারীদের অধিকারের একধরনের অগ্রসরতা বলে চালিয়ে দিতে চায়। হোয়াইট হাউজের ডেপুটি কমিউনিকেশনস সেক্রেটারি জেসিকা দিত্ত বলেছেন, ‘এটা দুঃখজনক, কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয় যে ঘৃণাকারীরা ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। ইভাঙ্কা নারীর ক্ষমতায়নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে মিলে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন। ইভাঙ্কা কেবল প্রেসিডেন্টের কন্যাই নন, তিনি প্রেসিডেন্টের একজন সিনিয়র উপদেষ্টাও।’

ইভাঙ্কা ট্রাম্পের এ ধরনের লোকদেখানো ‘কূটনৈতিক তত্পরতা’ এবং পাবলিক রিলেশন মেনে নেওয়া হচ্ছে কেবল ট্রাম্পের কন্যা হিসেবেই নয়, একই সঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্টের শ্বেতাঙ্গ কন্যা হিসেবেও। কল্পনা করতে পারেন, ইভাঙ্কা যা করে পার পেয়ে যাচ্ছেন, তার এক-দশমাংশ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মেয়ে করলে কী প্রতিক্রিয়া হতো? কল্পনা করতে পারেন, কী হতো যদি ওবামা তার একটি মেয়েকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের স্তরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ঠেলে দিতে চাইতেন? ফরাসি প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের লাউঞ্জে যদি ইভাঙ্কা না হয়ে মালিয়া ওবামাকে মিশিয়ে দেওয়া হতো? ইভাঙ্কা ট্রাম্প আমাদের শুধু স্বজনপ্রীতির সর্বোচ্চ শিখরেই নিয়ে যাননি, একই সঙ্গে তাঁর বাবার প্রশাসনে সাদাদের প্রভাব কতটা গভীরে, সেটাও প্রকাশ করেছেন।

ইভাঙ্কা ট্রাম্প বিপজ্জনক শুধু এ কারণে নয় যে তিনি আসলে কী কাজ করছেন তা কারো জানা নেই। বিপজ্জনক এ কারণেও যে তার যোগ্যতার অভাব রয়েছে। কূটনীতিকের ভান করে তার পিতার পাশে থাকার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্সের প্রশ্নটিও আছে। দি ডেমোক্রেটিক কোয়ালিশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্কট ডরকিন সম্প্রতি নিউজউইককে বলেছেন, ‘ইভাঙ্কার হোয়াইট হাউজে কাজ করা উচিত নয়, এটাই মূল কথা। এর কারণ অফুরন্ত।’

কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তার কন্যাকে নিয়োজিত না করার ক্ষেত্রে কোনো কারণই ট্রাম্পের জন্য কারণ নয়। প্রেসিডেন্ট যখন দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ইভাঙ্কাকে পরিচয় করিয়ে দেন, তখন উল্লাসের সঙ্গে বলতে থাকেন, ‘সে সবার নজর কাড়তে যাচ্ছে! সে নজর কাড়বে।’

এরপর যখন ইভাঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও মঞ্চে উঠে আসেন, তখন সেনা সদস্যদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘ইভাঙ্কা ও পম্পেও হলেন বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট।’

আমি মনে করি, এটাই সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা :ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব যেন একটি শো এবং তার মেয়ে হলো সেই শো-এর একজন স্টার।

ইংরেজি থেকে অনূদিত

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ