ইমরান নাজির
গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষভাগ থেকেই আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থায় বৈদেশিক বিনিয়োগের ধারণা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। বাণিজ্য উদারীকরণের বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এই বিনিয়োগ ব্যবস্থায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের সঠিক ব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক শক্তিশালী হাতিয়ার। বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রভাব অবস্থাভেদে ভিন্ন হলেও বাংলাদেশে এর প্রভাব তুলনামূলক ইতিবাচক ও আশীর্বাদস্বরূপ। ২০২৪ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশ হবার পথে কর্মসংস্থান তৈরি ও শিল্পায়ন অগ্রসরের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে কর্মসংস্থান তৈরি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বৈদেশিক বিনিয়োগের ভূমিকা নিয়ে মূল আলোচনার পূর্বে প্রপঞ্চগুলো বুঝে নেয়া আবশ্যক। বৈদেশিক বিনিয়োগ অন্য সাধারণ বিনিয়োগের থেকে ভিন্ন। বিনিয়োগের স্থান,সম্পৃক্ততা ও মালিকানার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সোজা কথায় বৈদেশিক বিনিয়োগ হলো এমন এক ধরনের বিনিয়োগ যেখানে একটি দেশে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো এক দেশে মোটামুটি স্থায়ীভাবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে থাকে এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়। বৈদেশিক বিনিয়োগকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করা গেলেও দুটি ভাগে সরলীকরণ করা যায়। নতুনভাবে কোনো কারখানা তৈরিতে বিনিয়োগ করে অথবা কোনো কোম্পানিকে কিনে নিয়ে সেখানে পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর করার মধ্যদিয়ে।
খুব সম্প্রতি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ কমলেও বাংলাদেশে বেড়েছে এর পরিমাণ যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির ছাপ বহন করে। গতবছর ৩.৬১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ গ্রহণ করে আগেরবারের তুলনায় ৬৮ শতাংশ বেশি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্বিতীয় অবস্থানে। এই অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সস্তা শ্রমিক, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ওয়ান স্টপ সার্ভিস, দেশীয় বাজার চাহিদা, পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ করার মতো প্রণোদনা।
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বাংলাদেশে বেকার সংখ্যা ২৬ লাখ। অপ্রত্যাশিতভাবে শিক্ষিতদের মাঝে বেকারত্বের চিত্র সব থেকে প্রকট। বেকারত্বের বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকলেও মূলত কর্মক্ষেত্রের অভাব। পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও বেকারত্ব বাংলাদেশে জড়িয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে পুঁজি বিনিয়োগের অভাব বাংলাদেশে এখনো পশ্চাত্পদ। শিল্পায়নের চিত্রও অতটা পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত নয়। এই অবস্থার উন্নতিতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। কেননা বেশি বিনিয়োগ বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক যা সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে। এছাড়াও খাদ্য, টেলিকম ও শক্তি উত্পাদন সেক্টরেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে যা কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
মোটামুটি সব অর্থনীতিবিদই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে উচ্চহারে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু অপর্যাপ্ত পুঁজির কারণে তা বৃহত্ভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বাণিজ্যযুদ্ধ কিছুটা হলেও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয়েছে। চীন হতে যুক্তরাষ্ট্রীয় বিনিয়োগগুলো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। রাজনীতির মতো অর্থনীতির মাঠ দখলও এখন কূটনীতির মাধ্যমে করতে হয়। পূর্বে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতি চললেও বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক জোট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেরও উচিত হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে দেশীয় বাধাগুলো উত্তরণ করা সব থেকে বেশি জরুরি। প্রথমত, বিনিয়োগের ভালো স্থান হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০ দেশের মধ্যে ১৭৭। দুর্নীতির কারণে সুশাসন ও স্বচ্ছতার দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা নেবার ক্ষেত্রেও মন্থর গতি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে অন্তরায়। গ্যাস, বিদ্যুতের অভাবও স্পষ্ট ইদানীংকালে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক অঞ্চলের পুরোপুরি বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনা সমস্যা কিছুটা হলেও কমাবে। দীর্ঘ পরিকল্পনা মাথায় নিয়েই বাংলাদেশকে বিনিয়োগে হাত দিতে হবে। অনুদানের থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগ ঢের উত্তম ও কার্যকরি একটি দেশের জন্য। বাংলাদেশের উচিত হবে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশের অভিজ্ঞতা থেকে নিজের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যা শুধু প্রবৃদ্ধিই তৈরি করবে না বরং কর্মসংস্থান তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
