শিফারুল শেখ
ক্ষমতাসীন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা করতে পারেননি, তাই করে দেখিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। টুইট করার পরের দিনই কিম জং উনের দেশ উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রেখে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তবে এই ইতিহাস কোরীয় অঞ্চলকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করতে কতটা ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সমালোচকরা। কারণ এর আগে দুইবার তাদের মধ্যে শীর্ষ বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সফলতা আসেনি।
যেভাবে ইতিহাস
অনেকেই জানেন, জাপানের জি-২০ সম্মেলন ত্যাগের আগে ২৯ জুন টুইটারে বার্তা পাঠান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ৩০ জুন দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে কিম জং উনের সঙ্গে হাত মেলানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাই ঘটে। সবাইকে বিস্মিত করে যে, এক দিনের মধ্যেই দুই নেতার সাক্ষাত্ কিভাবে সম্ভব। কিন্তু বৈঠকের অন্তরালের খবর ভিন্ন। মার্কিন মিডিয়া সিএনএন জানিয়েছে, গত ১০ জুন কিম জং উন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি চিঠি পাঠান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও চিঠি পাঠান কিমকে। দুই চিঠিকেই মজার বলে উল্লেখ করেন দুইজন। কিন্তু চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
উত্তর কোরিয়া এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জাপানি মিডিয়া আশাহি শিম্বুনও জানিয়েছে, অনেক আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিমকে দুই কোরিয়ার অসামরিক এলাকা পানমুনজামে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সিএনএন জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন মিডিয়া দ্য হিলকে বিশেষ সাক্ষাত্কার দিয়েছিলেন যেখানে তিনি বলেছিলেন, ২৪ জুনের মধ্যে অসামরিক এলাকায় বৈঠকের জন্য কিমকে তিনি আমন্ত্রণ জানাবেন। কিন্তু নিরাপত্তায় হুমকি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে হোয়াইট হাউজ ওই সাক্ষাত্কার প্রকাশ না করার অনুরোধ জানায়। ফলে এটা ধরে নেওয়া যায়, ট্রাম্পের উ. কোরিয়ায় পা রাখা, কিমের দ. কোরিয়ার ফ্রিডম হাউজে ট্রাম্প ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের সঙ্গে বৈঠক পূর্বপরিকল্পিত।
সফলতা নিয়ে সংশয়
কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের তিন দিন পর একটি বিবৃতি দেয় জাতিসংঘে কার্যত উত্তর কোরিয়ার মিশন। অভিযোগ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার কথা বলে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে নাছোড় বান্দার মতো আচরণ করছে এবং কোরীয় উপদ্বীপের শান্তিকে নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে। বৈঠকের দিনই উ. কোরিয়ার কর্মীদের দেশে ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। বিবৃতিতে কিমের সরকার জানায়, ওই চিঠিতে একটা সত্য প্রকাশ পেল যে, যুক্তরাষ্ট্র তার সিদ্ধান্তে অনড় এবং নিষেধাজ্ঞাকে সব রোগের ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করছে যা সত্যিই হাস্যকর। এই বিবৃতি উত্তর কোরিয়ার আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এস নাথান পার্কের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো কূটনীতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। একটা ইতিবাচক বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছেন। যে কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে কিমের সঙ্গে স্বল্প সময়ের নোটিশে মিলিত হতে পারেন এমন একটা ধারণাও পাওয়া যাচ্ছে।
সমালোচক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী ক্রিস্টাইন অহনের মতে, ট্রাম্প ও কিমের ৩০ জুনের ছবিগুলো বেশ আকর্ষণীয়, ঐতিহাসিক ও আশ্চর্যের। কিন্তু সফলতা নিয়ে সংশয় আছে। যদিও নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন উ. কোরিয়ার সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি করতে পারে। এর আওতায় উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রকে সীমার মধ্যে বেঁধে দেওয়া, পরমাণু অস্ত্র তৈরির পদার্থ জব্দ করা এবং পরীক্ষা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া। জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিমের কাছে একটি ফাইল দিয়েছেন যাতে সব পরমাণু অস্ত্র ও তৈরির পদার্থ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া আগেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলেছে। ক্রিস্টাইন অহন মনে করছেন, সফলতার জন্য তিনটি কঠিন বিষয়কে অতিক্রম করতে হবে।
প্রথমত, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে উ. কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করা যাবে না। কারণ জাতিসংঘই জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। তারা চাকরিচ্যুত হন। মানবাধিকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করছেন। দ্বিতীয়ত, শান্তি আলোচনাকে কিমকে উপহার হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না। এটাকে কোরীয় উপদ্বীপের মানুষের নিরাপত্তা হিসেবে মনে করতে হবে। কারণ গত বছর হাওয়াই দ্বীপে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের একটি মিথ্যা সংকেত বেজেছিল। তাতেই মানুষ ভীত হয়ে পড়েছিলেন। আর গত বছর সিঙ্গাপুরে ট্রাম্প-কিম বৈঠকের পর ৪০০ দিন উত্তর কোরিয়া কোনো পরীক্ষা চালায়নি। তৃতীয়ত, ইরান, লিবিয়া, ইরাক সরকারের মতো ভুল করবে না কিম। কারণ এ তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করলেও শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়ের মুখেই পড়েছে। তারা কোরীয় যুদ্ধের কথাও ভুলেনি যেসময়ে মার্কিন হামলায় নিহতদের মধ্যে প্রতি চারজনে একজন ছিলেন উ. কোরিয়ান। ফলে কিমের শত্রু থেকে বন্ধু হওয়া ট্রাম্পের সফলতা নিয়ে সংশয় থাকলেও নতুন কূটনীতি তার আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কাজে লাগতে পারে।
