তারিক হাসান
পশ্চিমবঙ্গের জনগণের ভাষা বাংলা। তাই রাজ্যের নামও বদল করে ‘বাংলা’ হোক, এমন দাবি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির। পালটা বিজেপি পরিচালিত ভারত সরকারের মন্তব্য, এটা হলে বাংলাদেশ নামের সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। আর এটাকে কেন্দ করেই পশ্চিমবঙ্গের নাম বদল নিয়ে বিরোধ চরমে উঠেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মধ্যে।
বিজেপির দাবি, পশ্চিমবঙ্গ নামটির সঙ্গে দেশভাগের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। নাম বদল করে ‘বাংলা’ রাখা হলে ইতিহাস হারিয়ে যাবে। পাশাপাশি ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, পাশেই বাংলাদেশ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নাম বাংলা হলে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। পালটা মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য, দেশভাগের আগে পাঞ্জাব একটাই প্রদেশ ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তানে পাঞ্জাব প্রদেশের একটা বড়ো অংশ পরিচিত পাঞ্জাব নামে। লাগোয়া ভারতের আরেকটি অঙ্গরাজ্য যেটি দেশভাগের ফলে তৈরি হয়েছে সেটির নামও এখন পাঞ্জাব। এক্ষেত্রে অসুবিধা না হলে বাংলাদেশের পাশে অবস্থিত তাই পশ্চিমবঙ্গের নাম বদল করে বাংলা রাখা হলে অসুবিধা হবে কেন?
পশ্চিমবঙ্গের নাম বদল নিয়ে উদ্যোগ অবশ্য শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে। তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সময়ে বিধানসভায় সরকারের প্রস্তাব ছিল, একদা অবিভক্ত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে বিভক্ত হয়েছে। পাকিস্তানের দিকে বাংলার যে অংশটা গিয়েছিল, সেই পূর্ববঙ্গ নাম পরিবর্তিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান হয়। পরে স্বাধীন হয় এবং বাংলাদেশ নামে নতুন দেশ গঠিত হয়। অবিভক্ত বাংলার যে অংশটা ভারতে তার আর পশ্চিমবঙ্গ নামটা রাখার মানে হয় না। সরকারি দলের প্রস্তাব ছিল নাম হোক বঙ্গপ্রদেশ বা বাংলা।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল ও জাতীয় কংগ্রেস জোট সরকার ২০১১ সালের ২ সেপ্টেম্বর একটি প্রস্তাব আনে বিধানসভায়। প্রস্তাবটি ছিল রাজ্যের নাম ইংরেজি ওয়েষ্টবেঙ্গলের পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ লেখা হবে। ইংরেজি বর্ণমালায় ‘ডাব্লিউ’র অনেক আগে ‘পি’ আসে বলে রাজ্যের প্রতিনিধি ফিন্যান্স কমিশন কিংবা আন্তঃরাজ্য মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় আলোচনাসভায় কিছুটা আগে কথা বলার সুযোগ পাবে। রাজ্যের দাবিদাওয়া উত্থাপনের সুযোগ পাবে। কেন্দ্র সরকারের বৈঠকগুলোতে ইংরেজি বর্ণমালা অনুযায়ী রাজ্যগুলোকে বলার সুযোগ দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সুযোগ হয় সবার শেষে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজি না হওয়ায় ২০১৬ সালে ফের একবার পশ্চিমবঙ্গের নাম বদল নিয়ে প্রস্তাব পাশ হয়। ঠিক হয় পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে ‘বাংলা’ বা ‘বঙ্গ’ হোক। ইংরেজিতে নাম হবে ‘বেঙ্গল’। সেই প্রস্তাবটিও কিছুদিন পর খারিজ করে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তৃণমূলের দাবি, অতীতে ভারতের বহু রাজ্য এবং শহরের নাম বদলের নজির রয়েছে। ভারত ভাগের পর পাঞ্জাবের পূর্ব অংশের নাম হয় ‘পূর্ব পাঞ্জাব’। পরে নাম বদল করে পাঞ্জাব রাখা হয়। একই রকমভাবে ইউনাইটেড প্রভিন্স হয় উত্তরপ্রদেশ। হায়দ্রাবাদ রাজ্যের নাম হয় অন্ধ্রপ্রদেশ, ত্রিভাঙ্কুরুকোচিন হয় কেরালা।
মধ্যভারতের নাম বদল করে হয় মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজপ্রদেশের নাম বদল করে হয় তামিলনাড়ু, উত্তরাঞ্চল হয় উত্তরাখণ্ড, ওড়িশা হয় ওডিশা। একই রকমভাবে ব্যাঙ্গালোর শহরের নাম বদলে হয় বেঙ্গালুরু, মাদ্রাজ হয়ে যায় চেন্নাই, বোম্বাই হয় মুম্বাই, ক্যালকাটা হয় কলকাতা, হায়দ্রাবাদ শহরের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে হায়দরাবাদ। সম্প্রতি এলাহাবাদ শহরের নাম বদল করে হয়েছে প্রয়াগরাজ। তাই পশ্চিমবঙ্গের নাম বদল নিয়ে মমতা, মোদির রশি টানাটানি চলছেই।
