এম এ আলআমিন
পারস্য উপসাগরে বেজে চলেছে যুদ্ধের ডঙ্কা। ১২ মে ওমান উপসাগরে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার আক্রান্ত হয়। এরপর থেকে যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমেই বেড়েছে। ২০ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে অনতিবিলম্বে সেটি প্রত্যাহার করে নেন। তেহরান ও ওয়াশিংটন এবার যুদ্ধ এড়াতে পারলেও এর আশঙ্কা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয় কেউই। যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে কিছু একটা করতে বদ্ধ পরিকর। তবে ওয়াশিংটনে নীতিনির্ধারক মহল এ বিষয়ে একমত হতে পারছে না। এক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের একমাত্র হাতিয়ার নিষেধাজ্ঞা। অন্যদিকে ইরান চাইছে মনুষ্যবিহীন টহল ড্রোন ভূপাতিত করে নিজের ক্ষমতা জানান দিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে।
চার বছর আগেও তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্ক এতটা খারাপ ছিল না। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইরান ও ছয়টি দেশের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছিল ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি। চুক্তিটি হওয়ার পর পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত করার বিনিময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো থেকে কিছুটা রেহাই পায়। এ চুক্তি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আপাত বৈরিতার অবসান ঘটালেও দুদেশের মধ্যে অনাস্থা দূর করতে পারেনি। পারেনি ইরানের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পরিবর্তন আনতেও। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে থেকেই পরমাণু চুক্তির বিরোধী ছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশটির ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেন এবং এক পর্যায়ে ঐ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন।
ইরান-মার্কিন বর্তমান দ্বন্দ্বের প্রধান ইস্যু পরমাণু কর্মসূচি। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও বৈরিতা চলে এসেছে তার মূল কারণ অবশ্য পরমাণু কর্মসূচি নয়। এর মূল আরো গভীরে। হামাস ও ইসলামিক জিহাদের মতো ফিলিস্তিনী মিলিশিয়া গ্রুপ এবং হিযবুল্লাহর মতো লেবাননের প্রভাবশালী গ্রুপকে ইরান সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্রদের বৈরী পক্ষগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে তেহরানের। ইরাকের শিয়া যোদ্ধাদের প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকে ইরান। তারা এখনো সেখানে মার্কিন সৈন্যদের জন্য হুমকি।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ধকল এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে ইরানের অর্থনীতির ওপর। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে ইরানের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে। প্রথমটি হলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসা, দ্বিতীয়টি ২০২০ সালে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে যাবেন এমন আশা নিয়ে অপেক্ষা করা এবং তৃতীয়টি হলো উত্তেজনা জিইয়ে রেখে যতটা সম্ভব নিজেকে রক্ষা করা। অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়বে, যার প্রভাব মার্কিন অর্থনীতির ওপরও পড়বে। অবস্থা দেখলে মনে হয় ইরান তৃতীয় বিকল্পটি বেছে নিয়েছে। ১২ মে ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কারে হামলার জন্য ইরানই দায়ী— একথা এখন মোটামুটি পরিষ্কার। মার্কিন কর্মকর্তারা এ ঘটনার জন্য ইরানকে বারংবার সতর্ক করেছেন। দেশ দুটি প্রায় যুদ্ধের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প সুর পাল্টান।
আবে ১৩ জুন তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছে ট্রাম্পের একটি চিঠি পৌঁছে দেন। ঐ চিঠিতে ট্রাম্প সংলাপে বসার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। খামেনিই আবের মাধ্যমে দেয়া ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। একই দিনে ওমান উপসাগরে আরো দুটি তেল ট্যাঙ্কার আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে একটি জাপানী ট্যাঙ্কার ছিল। এ ঘটনার জন্য ট্রাম্প আবারো ইরানকে দায়ী করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপের আগ্রহ প্রকাশ হয়তো যথেষ্ট আন্তরিকতাপূর্ণ ছিল না কিন্তু তেহরান সেটিকে পাত্তা না দিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা একধাপ বাড়িয়ে দেয়। তেহরানের বক্তব্য- নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় কোনো সংলাপ নয়। মনে হচ্ছে উত্তেজনা বাড়ানো ছাড়া ইরানের হাতে কোনো বিকল্প নেই। দেশটি সম্ভবত সে পথেই হাঁটছে। ২০ জুন ইরান পারস্য উপসাগরে একটি মার্কিন টহল ড্রোন বিধ্বস্ত করে। এ ঘটনার পর ট্রাম্প ইরান আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে অল্প পরেই তা প্রত্যাহার করে নেন। ইরান এরপর চুক্তিতে বেঁধে দেয়া সীমা টপকে ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট করে। প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, ইরান আগুন নিয়ে খেলছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এর জবাবে বলেন, তারা এনরিচমেন্ট প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবেন। সম্প্রতি জিব্রাল্টারের হাতে গ্রেস-১ নামের একটি ইরানি তেলবাহী সুপার ট্যাংকার আটক হওয়ার পর কঠোর পরিনতির হুমকি দেয় ইরান। যদিও এ যাত্রা যুদ্ধের ঝুঁকি এড়ানো গেছে। কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ বেধে গেলে তা কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। তাই সময় থাকতে উভয় পক্ষকেই সুবিবেচনার পরিচয় দিতে হবে।
