শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

নতুন যুগে ভারতের রাজনীতি

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ১০:৩৭

দীর্ঘ সাত দফার ভোট শেষে অবশেষে ফলাফলে জয় পেয়ে টানা তৃতীয় বারের মতো ভারতে সরকার গঠন করছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। জওহরলাল নেহেরুর পর টানা তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তবে এবার বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে অংশীদারদের সঙ্গে তাল মিলিয়েই সরকার চালাতে হবে।

তাদের কথার বাইরে গেলে সরকার ভেঙে যেতে পারে এমন আশঙ্কা ভারতে দেখা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে রাজনীতিতে নতুন যুগ তৈরি হতে পারে যা ভারতের জনগণ আগে কখনো দেখেনি। এমন আশঙ্কা বাড়ছে যে, যে কোনো সময় নতুন নির্বাচনও হতে পারে। তবে এবার দেশটিতে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি কমবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এনডিএ জোটের নেতাদের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি।

নতুন যুগে ভারতের রাজনীতি

২০১৪ সালে বিজেপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় স্থান পেয়েছিল যে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে নতুন যুগের শুরু হলো। ১০ বছর পর এখনো সেই ধরনের লেখাই মিডিয়ায় স্থান পেয়েছে। এবার বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠা না পাওয়ায় অংশীদারদের ওপরই নির্ভর করতে হবে। কিন্তু বড় সমস্যা হলো নীতিশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুকে নিয়ে। কারণ এই দুই নেতার এর আগে ডিগবাজি দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এই ধরনের ডিগবাজি দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে। এর আগে দুই বারের মেয়াদে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ‘মোদি সরকার’ হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু এবার সেটা ভিন্ন। ফলাফল ঘোষণার পরপরই এনডিএর বৈঠক হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদি এক বারের জন্যও ‘মোদি সরকার’ বলেননি। বলেছেন এনডিএ সরকার।

এনডিএর প্রতিনিধি হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে বেছে নেওয়ার পরে এক ঘণ্টা ১২ মিনিট বক্তৃতা করেন তিনি। দেখা যায়, মোদি সেই ভাষণে নিজের নাম তো নিলেনই না। উচ্চারণ করলেন না বিজেপির নামও। এক মাস আগেও লোকসভা ভোটের প্রচারে রাজ্যে রাজ্যে গিয়ে ‘মোদির গ্যারান্টি’র বিজ্ঞাপন করছিলেন। একটি সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, লোকসভা ভোটের প্রচার পর্বে মোদি তার নামোচ্চারণ করেছেন ৪২১ বার। মোদির বক্তৃতাতেও ঘুরেফিরে আসত ‘মোদি কি গ্যারান্টি’র প্রসঙ্গ। গত শুক্রবারের বক্তৃতাতেও অবশ্য মোদি তার বক্তৃতায় গ্যারান্টির কথা বলেছেন একবার। বদলে মোদির মুখে ঘুরেফিরে ৩৯ বার এসেছে এনডিএর কথা। অ্যালায়েন্স শব্দবন্ধগুলোও ঘুরেফিরে এসেছে ১৫-১৬ বার। মোদিকে ইঙ্গিত দিতে দেখা গেল, আগামী ২৫ বছর তাদেরই সরকার থাকবে কেন্দ্রে। তিনিও থাকবেন কি? আপাতত, আগামী পাঁচ বছর কী হয় সে দিকেই তাকিয়ে দেশ।

মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের আগে এনডিএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন নরেন্দ্র মোদি। নয়াদিল্লি, ০৯ জুন। ছবি: এএনআই

নতুন শঙ্কা

ভারতের ইতিহাসে কোনো সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হয়নি এমন বাক্য নেই। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বলা হয় যে, কোনো সরকারই তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। তবে সেখানে সামরিক বাহিনীর প্রাধান্য আছে। ভারতে সেটা হয়তো ভাবাই যায় না। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে দেশটিতে সেনাবাহিনী নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। শঙ্কা জোট সরকারের মতবিরোধ এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে। ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের নেতারা বলতে শুরু করেছেন যে, ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশে নতুন নির্বাচন হবে। এই মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস নেতা ভূপেশ বঘেল। ছত্তিশগড়ের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বঘেলের যুক্তি, তৃতীয় মোদি সরকার গঠনের আগেই এনডিএ জোটে টানাপড়েন শুরু হয়ে গেছে। সরকার তৈরি হলেই ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে। বঘেল কংগ্রেসের সভায় বলেছেন, ‘সবাইকে তৈরি থাকতে হবে। ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে অন্তর্বর্তী নির্বাচন হতে পারে। মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে দেবেন্দ্র ফডনবীস পদত্যাগ করছেন। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের গদি নড়ছে। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মাও কাঁপছেন।’

বঘেলের যুক্তি, নতুন সরকার গঠনের আগেই জেডিইউ অগ্নিবীর প্রকল্প বাতিল, জাতগণনার দাবি তুলছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দরকার নেই বলছে। এর পরে সরকার গঠন হলে ঝগড়া শুরু হবে। তখন ঘরে ভাঙন ধরতে দেরি হবে না। কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে দলের মুখপাত্র পবন খেরা বলেন, ‘বিজেপির মধ্যে অনেক ঝড় উঠছে। আরএসএসের মধ্যে, এনডিএর মধ্যে, গুজরাটে, উত্তরপ্রদেশে। ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে। সবাই দেখতে পাচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস রোমহর্ষক হতে চলেছে।’

শনিবার নরেন্দ্র মোদি পুরোনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলে এনডিএর বৈঠকে বলেছেন, কংগ্রেস ভোটের আগে মহিলাদের ১ লাখ রুপি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন মুসলিম মহিলারা লখনউয়ের কংগ্রেস অফিসে সেই টাকা চেয়ে ভিড় করেছেন। পবন খেরা পালটা কটাক্ষ করে বলেন, ‘কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। তেলুগু দেশম ভোটের আগে বলেছিল, মুসলিমদের ৪ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া হবে। মোদি এতদিন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ধর্মের ভিত্তিতে মুসলিমদের সংরক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ তুলছিলেন। এখন চন্দ্রবাবু নাইডুকে নিয়ে কী করবেন?’

জোটসঙ্গীরা এবার পাবে গুরুত্ব

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। বলা হয়, মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার আসলে মোদি-শাহের সরকার। অর্থাত্, এই সরকারের দুই প্রধান মুখ নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ। ২০১৯ সালেও এই দুই মুখই বিজেপিকে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়। ফলে খাতায় কলমে এনডিএ জোট থাকলেও মোদি-শাহকে কখনোই জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। অভিযোগ, নির্ভর করতে হয়নি বলে জোটসঙ্গীদের সে অর্থে কখনো গুরুত্বও দেয়নি মোদী-শাহের বিজেপি।

যে কারণে, যত দিন গেছে এনডিএ ছেড়ে বেড়িয়ে গেছে একাধিক দল। পাঞ্জাবের শিরোমনি আকালি দল, শিবসেনার উদ্ধব শিবির, দক্ষিণের এআইএডিএমকে-র মতো গুরুত্বপূর্ণ দল বিজেপিকে ছেড়ে চলে গেছে। যারা থেকে গেছে, তারাও বার বার অভিযোগ করেছে, জোটের ভিতর তাদের কার্যত গুরুত্ব নেই। এই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের নির্বাচন তাদের সামনে নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে। বিজেপি সূত্র ডয়চেভেলেকে জানিয়েছে, নীতিশ কুমার, চন্দ্রবাবু তো বটেই, লোক জনশক্তি পার্টির নেতা চিরাগ পাসওয়ানও বিজেপির ওপর চাপ তৈরি করতে শুরু করেছেন। মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিয়ে দর কষাকষি শুরু হয়ে গেছে। কোনো কোনো সূত্র থেকে এমনও শোনা যাচ্ছে, নীতিশ কুমার উপপ্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো দর হেঁকে রেখেছেন। পিছিয়ে নেই চন্দ্রবাবুও।

বিজেপির ভেতরে দ্বন্দ্ব

মোদি-শাহের সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে তাদের দলেরই একটি অংশ। বিজেপির সূত্রের দাবি, সংঘ-ঘনিষ্ঠ নীতিন গডকড়ীর মতো নেতারা মোদি-শাহের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেন। মন্ত্রিসভা বদলের দাবি উঠতে পারে বিজেপিরই অন্দরে মোদি-শাহ বিরোধী শিবির থেকে। কারণ, বিজেপিরই একাংশ মনে করছে, এনডিএ জোট জিতলেও এই ভোট মোদি-শাহের বিরুদ্ধে গেছে। ভারতীয় সংবিধানের নিয়ম মেনে সব চেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলকেই রাষ্ট্রপতি প্রথমে সরকার গড়তে ডাকবেন। সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া বিজেপিকেই ডাকা হবে, তা নিশ্চিত। এরপর সংসদে বিজেপিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে। আর তখনই এই সমস্ত রাজনৈতিক সমীকরণ সামনে আসবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক কৌশল হলো, ইন্ডিয়া জোটে ভাঙন ধরানো। ইন্ডিয়ার বেশ কিছু নেতার সঙ্গে বিজেপি কথা বলার চেষ্টা করছে বলে সূত্র জানায়।

ইত্তেফাক/এএম