নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দাবি করা সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি চায় গ্রামীণফোন। তবে বিটিআরসি বলছে, তারা যে অ্যাক্ট দ্বারা পরিচালিত হয় সেখানে সালিশের মাধ্যমে অর্থ দাবির নিষ্পত্তির কোনো সুযোগ নেই। দুই প্রতিষ্ঠানের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোনকে যে লাইসেন্স দেওয়া হয়, সেখানে সালিশে নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা হয়েছিল। ফলে তারা এই সুবিধা পেতেই পারে। বিটিআরসির অ্যাক্টে যাই থাকুক না কেন, আরবিট্রেশন (সালিশে নিষ্পত্তি) অ্যাক্টে বলা আছে, বিদ্যমান আইনে যাই থাকুক না কেন, যে কেউ আরবিট্রেশনের সুযোগ নিতে পারবে। ফলে বিটিআরসি যদি বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি চায় তাহলে তারা আরবিট্রেশনে যেতে পারে। আইনে সেই সুযোগ আছে।
গ্রামীণফোনের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিতে গত বৃহস্পতিবার আইআইজি অপারেটরদের নির্দেশ দেয় বিটিআরসি। একই সঙ্গে আরেক মোবাইল ফোন অপারেটর রবিরও ১৫ শতাংশ ব্যান্ডউইথ সীমিত করতে আইআইজিকে নির্দেশ দেয়। গতকাল বিটিআরসি বলেছে, টাকা না দেওয়া পর্যন্ত ব্যান্ডউইথ সীমিত থাকবে।
গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সালিশের মাধ্যমে তারা এটার সুরাহা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিটিআরসি সে পথ রুদ্ধ করে দিল। গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ফোলি বলেন, বিটিআরসির নির্দেশনাটি এমনভাবে দেওয়া হয়েছে, যাতে গ্রাহকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, গ্রামীণফোনের ওপর চাপ তৈরি হয়। এ নির্দেশনার ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট আইআইজি অপারেটরদের ওপরও।
বিটিআরসির দাবি অনুযায়ী গ্রামীণফোনের কাছে নিরীক্ষা আপত্তির দাবির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং রবির কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। ব্যান্ডইউথ সীমিত করার জন্য গ্রামীণফোনের কী ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারপ্রাপ্ত সিএমও মোহাম্মদ সাজ্জাদ হাসিব বলেন, বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে, তবে গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের কী ভর্তুকি দেওয়া হবে জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হোসেন সাদাত বলেন, বিষয়টি আমরা পর্যালোচনা করছি। আমাদের বিশেষজ্ঞ টিম এ নিয়ে কাজ করছে। এখনও রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
গ্রামীণফোনের এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক কমিশনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, বিটিআরসির আইন অনুযায়ী আরবিট্রেশন বা সালিশের কোনো উপায় নেই, তবে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। পাওনা টাকা অপারেটরদের দিতেই হবে। এখন আইনে না থাকলেও এ ধরনের বিরোধ মীমাংসার জন্য যে আরবিট্রেশনের সুযোগ থাকা উচিত সে কথা বিটিআরসি প্রধান স্বীকার করে বলেন, আইন সংশোধনের জন্য লম্বা সময়ের প্রয়োজন। যা গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে এখন প্রযোজ্য হবে না। আমরা আরবিট্রেশনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে আইন সংশোধনের জন্য ইতিমধ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। গ্রামীণফোন সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখতে চায়। আমরা তাদের টাকা দিতে বলেছি। তবে আলোচনার পথ খোলা আছে।
টাকা না পেলে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলেন, বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্ত, পরবর্তীতে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কী করা যায়। আইন অনুযায়ী এ ধরনের ক্ষেত্রে অপারেটরের লাইসেন্স বাতিলসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে আইআইজি অপারেটরদের পর গতকাল রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম কোম্পানি বিটিসিএলকেও গ্রামীণফোন ও রবির ব্যান্ডউইথ কমাতে নির্দেশ দিয়েছে বিটিআরসি। বিটিসিএলকেও তা অবিলম্বে কার্যকর করতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
