এমপি আজীম হত্যাকাণ্ড

চোরাচালানের পর মিলছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪, ০৮:০০

ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে জড়িত গডফাদার, প্রভাবশালী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও কিছু সংখ্যক বড় বড় ব্যবসায়ীদের জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে আসছে। এমপি আনারের কন্যা মুমতারিন ফেরদৌস ডরিনও তার পিতার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে এবং জড়িত খুনিদের রক্ষা করতে বড় বড় জায়গা থেকে ফোন আসছে বলে তথ্য পেয়েছেন। এই তথ্য তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্বর্ণ চোরাচালান, হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং মাদক পাচারের নিয়ন্ত্রণকে এমপি আনার হত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গ্রেফতারকৃত খুনি ও রাজনৈতিক নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে একের পর এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক বিরোধ। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকার একাধিক নেতা ও এমপি আনারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, গ্রেফতারকৃত ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম মিন্টুর নির্বাচনি আসন হরিনাকুন্ড উপজেলা। সেখানে নির্বাচিত হয়েছেন একজন ক্ষমতাধর বড় ব্যবসায়ী। এই আসনে মিন্টুর পক্ষে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। আর নির্বাচন করলেও তার জয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। 

মোটকথা এলাকাবাসির তথ্য অনুযায়ী, মিন্টুর এই আসন হাতছাড়া। তাই তার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ঝিনাইদহ-৪ আসনে নির্বাচন করা। এ নিয়ে তিনি সামনের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্ষমতাসীন একাধিক এমপি ও দলীয় নেতাকে আর্থিকসহ নানা সুবিধা প্রদান করে আসছেন। ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েও এমপি আনার ও মিন্টুর মধ্যে বিরোধ ছিল। এমপি আনার বেঁচে থাকলে মিন্টুর এমপি হওয়া কিংবা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। মিন্টু এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীদের একজন বলে এলাকার একাধিক নেতা জানিয়েছেন। কালীগঞ্জ এলাকার এমপি আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত কথিত সিবিআই নেতাসহ একাধিক ব্যক্তি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে এলাকাবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। কলকাতার সঞ্জীবা গার্ডেনে গত ১৩ মে এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর ঐ সকল জড়িত ব্যক্তিরা আত্মগোপনে চলে যান। প্রভাবশালী এমপি ও ব্যবসায়ীদের আশ্বাসেই তারা এখন আবার এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

গতকাল বুধবার এমপি আনারের কন্যা ডরিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। এ সময় তার পিতা এমপি আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনিদের রক্ষায় তাদের পৃষ্ঠপোষক প্রভাবশালীদের তৎপরতা এবং তদন্ত কার্যক্রমকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টাসহ বিস্তারিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমপি কন্যা ডরিনকে আশ্বাস দেন যে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বাস করেন যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো অপরাধীকে তিল পরিমাণ ছাড় দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত শেষে এমপি আনার কন্যা সাংবাদিকদের জানান, তার পিতার হত্যাকারীদের বাঁচাতে কিংবা গ্রেফতারকৃতদের ছাড়িয়ে নিতে বড় বড় জায়গা থেকে ফোন আসছে। এমন তথ্য তিনি জানতে পেরেছেন। এজন্য তার সন্দেহ যে পিতার হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ফলাফল আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বর্ণ চোরাচালান, হুন্ডি ব্যবসা ও মাদক পাচারের নিয়ন্ত্রণের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে শতাধিক ব্যক্তি খুন হয়েছেন। এমনকি অনেকে নিখোঁজও হয়েছেন। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের কোনোটিরই বিচার হয়নি। এমনকি নিখোঁজ কাউকেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তাই এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়েও এলাকাবাসীর মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল কালীগঞ্জ এলাকায় গ্রেফতারকৃত আওয়ামী লীগ নেতা মিন্টু ও কাজী কামালসহ খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। এলাকাবাসী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান যে, এমপি আনারের হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন আগের সব খুনের ঘটনার মতো ধামাচাপা না পড়ে।

ইত্তেফাক/এমএএম