‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!’ পঙি্ক্তর আগের কথাই এখন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য প্রযোজ্য, ‘আসিতেছে শুভদিন’। আর এই শুভদিন কেবল ঋণ শোধের নয়, নয়া স্বপ্ন দেখানোর অনুষঙ্গও বটে। নবম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তদের মনের কথা হয়তো এমনই, ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’। বিশ্বকাপে পা দেওয়ার আগে বেশি কিছু আশা করতে বারণ করেছিলেন দলীয় নেতা।
সেই অনুরোধের কারণও বুঝিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সিরিজ ও ভারতের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে। কিন্তু সেই ম্যাচগুলোর পরে টাইগার বাহিনী যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ হাতে পেয়ে গেল। এক এক করে স্বপ্নের নহরে আলোকধারার সঞ্জীবনী শক্তি রোপণ করতে শুরু করলেন তারা। সেই শক্তি এখন মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। তার ছায়ায় ভক্তরা কেবল শীতলই হচ্ছেন না, চিত্তাকর্ষক সত্তাকেও জাগিয়ে তুলছেন। আর তিরস্কারের শব্দগুলো সাধুবাদে ব্যস্ত রয়েছে।
আগামীকাল ভোর সাড়ে ৫টায় নেপালের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশে তখন ঈদের আমেজ থাকলেও চোখ ও মন খুঁজে ফিরবে ম্যাচের স্কোরলাইনে। মোবাইল ফোনের অ্যালার্ম ঘুম ভাঙাবে অনেক ভক্তের। প্রত্যাশা একটাই, জয় দিয়ে ঈদের খুশিকে আরও বাড়িয়ে দেবে টাইগার বাহিনী। ম্যাচটিতে বাংলাদেশ ধাক্কা খেলেও স্বস্তিতে রাখবে রানরেট।
আর সমসাময়িকে শ্রীলঙ্কা-নেদারল্যান্ডস ম্যাচে লঙ্কানরা জয় পেলে ভয়ের তো আর কারণই থাকবে না, শান্তরা হেরেও পৌঁছে যাবেন সেরা আটে। তবে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে জয়টাই কাঙ্ক্ষিত। শ্রীলঙ্কার ম্যাচটি শুরু হবে শান্তদের মাঠে নামার এক ঘণ্টা পরে, সকাল সাড়ে ৬টায়। ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গাদের বিদায় আগেই নিশ্চিত হয়েছে। তবে ডাচদের এখনো সুযোগ রয়েছে। শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পাশপাশি রানরেটে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলতে পারলে নেদারল্যান্ডস খেলবে সেরা আটে। এই জায়গায় বাংলাদেশ জয় তুলে নিতে পারলে আর কোনো সুযোগ থাকবে না স্কট অ্যাডওয়ার্ডসদের।
শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে বাংলাদেশ শুরু করেছে এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা। পরের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জিততে জিততে হেরেছেন শান্তরা। নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রত্যাবর্তন করে টাইগার বাহিনী। ম্যাচটিতে ব্যাট হাতে ‘হারিয়ে খুঁজে ফেরা’ সাকিব আল হাসানও ফিরেছেন। তাতে স্বপ্নের পরিধি আরও বেড়েছে। সেই পরিধি এখন অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও আফগানিস্তান ম্যাচকে আলিঙ্গন করছে। সেরা আটে গেলে এই তিন দলের বিপক্ষেই মাঠে নামতে হবে বাংলাদেশকে। কঠিন সে যাত্রায় আরেকবার জ্বলে ওঠার বিকল্প নেই। সফল হলে শান্তদের পেছনের কণ্টকাকীর্ণ পথটি মুহূর্তের মধ্যেই পুষ্পারতিতে ভরে উঠবে। বল হাতে টাইগার বাহিনী যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে কপালে ভাঁজ আঁকার শঙ্কা নেই। বড় দলগুলোর বিপক্ষে আসল লড়াইয়ে স্বস্তি পাওয়া যাবে।
চিন্তার কারণ বাংলাদেশের ব্যাটিং। ‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে টাইগার বাহিনীর ব্যাটিং। জ্বলে ওঠা তানজিদ হাসান তামিম যেন ঝোড়ো বাতাসে দুলছেন। অধিনায়ক শান্ত তো নিজের ব্যাটটাকেও শান্ত করে ফেলেছেন। লিটন দাস ‘হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি’ করেও সমস্যাটা খুঁজে পাচ্ছেন না। ‘ক্লাসিক ব্যাটার’ খ্যাত এই তারকা ম্যাচের পর ম্যাচে কেবল হতাশই করে যাচ্ছেন। সাকিবের ব্যাটিং কী ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর’ হবে? সকল প্রশ্নই ঘুরে ফিরছে। তবে তারকা এই অলরাউন্ডারকে নিয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি থাকে। তার অভিজ্ঞতা দলকে বিশেষভাবে সহায়তা করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে। অধিনায়ক না হলেও ২২ গজের লড়াইয়ে সাকিব তো ‘রাজা’। এজন্য ক্লাইমেক্স মুহূর্তে তাকে ভীষণ দরকার। তার সঙ্গে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও রয়েছেন। ব্যাট ও বল হাতে নিজের অভিজ্ঞতার চিত্রায়ণ সুনিপুণভাবে করছেন রিয়াদ। এভাবেই নতুন এক বাংলাদেশের সাক্ষাৎ মিলেছে বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে।
গ্রুপ পর্ব শেষে বাংলাদেশকে যেতে হবে আরও বহুদূর। সপ্তম আসরের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হাতছানি দিচ্ছে ভিন্ন এক অর্জন। ক্রিকেটের সব ফরম্যাটের শিরোপা একসঙ্গে উচিয়ে ধরার অপেক্ষায় দলটি। ওয়ানডে বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দল তারা। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাও তাদের দখলে। এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতলে তিন শিরোপাই থাকবে অজিদের দখলে। তাতে সেই আশা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে দলটি। আবার শিরোপা জিততে ভুলে যাওয়া ভারতও ক্ষুধার্ত হয়ে আছে। টি-টোয়েন্টিতে চমক দেখানো আফগানদের পেছনে রাখার সুযোগ কোথায়! ফলে আসল লড়াই এবার দরজায় কড়া নাড়ছে। চৌকাঠে কান রাখলে সেই নিনাদই শোনা যাচ্ছে। টাইগারদের এবার মাথা ঠাণ্ডা রেখে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই। চমকে চমকে ২২ গজে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর লড়াই। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের ক্ষমতা বোঝানোর লড়াই। গেছে যে অন্ধকার, সেই অন্ধকারেই হাসি ফোটানোর লড়াই। ‘হারা শশীর হারা হাসি অন্ধকারেই ফিরে আসে’ বিশ্বাসকে বাস্তবায়নের লড়াই।
‘ডি’ গ্রুপ পয়েন্ট টেবিল
দল ম্যাচ জয় পরাজয় নিট রান রেট পয়েন্ট
দক্ষিণ আফ্রিকা ৪ ৪ ০ +০.৪৭০ ৮
বাংলাদেশ ৩ ২ ১ +০.৪৭৮ ৪
নেদারল্যান্ডস ৩ ১ ২ -০.৪০৮ ২
নেপাল ৩ ০ ২ -০.২৯৩ ১
শ্রীলঙ্কা ৩ ০ ২ -০.৭৭৭ ১
