একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি/ তোমার জন্য গলির কোণে/ ভাবছি আমার মুখ দেখাবো/ মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে...কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার স্মৃতিই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বিজ্ঞাপনের দৃশ্যদূষণে ঢেকে যাওয়া রাজধানী ঢাকাকে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিফলক থেকে শুরু করে বিখ্যাত ব্যক্তিদের স্মৃতিচিহ্ন, নামফলক, পথচারী দিকনির্দেশক সবকিছুই ঢাকা পড়ছে বিজ্ঞাপনের আড়ালে।
করপোরেট থেকে শুরু করে গলির পাতিনেতা পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের আগ্রাসন ঘটিয়েছেন মাটি থেকে আকাশ অবধি। বাদ যাচ্ছে না সড়ক, মহাসড়ক, দেয়াল, সুদৃশ্য উন্নয়ন অবকাঠামোও। দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত সম্প্রসারণশীল রাজধানী ঢাকাকে তিলোত্তমা করার স্বপ্নে বড় বাধা এসব দৃশ্যদূষণ। যা অপসারণ করতে না পারলে বিজ্ঞাপন নামের আবর্জনার নিচে চাপা পড়বে গোটা রাজধানীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের নান্দনিকতা।
মহানগরীর যেদিকে চোখ যায় শুধুই নানা রঙের চটকদার বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক পোস্টার, শুভেচ্ছাবাণীতে ভরপুর। সড়ক, অলিগলির দুই পাশ, ভবনের দেয়াল, প্রাচীর, স্তম্ভ, বৈদ্যুতিক খুঁটি ঢেকে গেছে রুচিহীন বিজ্ঞাপনে। আর এসব রুচিহীনতার আড়ালে হারিয়ে গেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিফলক। সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর মালিবাগ মোড়ে ডিভাইডারের ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামাঙ্কিত উদ্বোধনী ফলকটি চাপা পড়েছে নানা স্তরের পোস্টারের নিচে।
এলিফ্যান্ট রোডের মোড়ে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা মিলে চাপা দিয়েছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের উদ্বোধনী ফলকটি। টিএসসির রাজু ভাস্কর্য চত্বরটিও ঢাকা পড়েছে পোস্টার, রং বেরঙয়ের ব্যানার আর নোংরা আবর্জনায়। একই দশা অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যের। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ এসব ভাস্কর্য ঘিরে অযত্ন অবহেলা প্রবণতা দৃশ্যদূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসটি ভবনটি ঢেকে গেছে নানা ব্যানারে। যার আড়ালে ঢাকা পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামটিও।
শুধু এসব চোখে পড়া দৃশ্যই নয়, গোটা রাজধানীর আনাচে কানাচে অলিতে গলিতে রুচিহীন, শ্লীল, অশ্লীল বিজ্ঞাপনের আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন, ঐতিহ্য নান্দনিকতা।
বিশেষজ্ঞ ও নগরবিশারদরা বলছেন, মহানগরীর ফ্লাইওভারগুলোর পিলারে পিলারে কিছু নান্দনিক দৃশ্য পরিস্থিতিকে খানিকটা বদলে দিলেও গোটা ঢাকা শহরের যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই শুধু দৃশ্যদূষণ। নানা রঙেঢঙে শ্লীল, অশ্লীল ভাষার বিজ্ঞাপনে শুধুই রুচির দীনতার বহিঃপ্রকাশ। জানতে চাইলে নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব ইত্তেফাককে বললেন, গণনান্দনিকতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপনের এই আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক মানসিকতার কাছে নগরীর স্বকীয়তাকে বিকিয়ে দেয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মধ্য দিয়ে মেয়রদের নির্দেশনা দিতে হবে যেন বাণিজ্যিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা যায়। খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বললেন, দৃশ্যদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের কারণে পথচারী ও চালকদের মাধ্যমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি।
সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ বাস্তবায়নে গেল বছরের ২ জানুয়ারি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। তাতে যত্রতত্র পোস্টার, রেক্সিন, দেওয়ালে চুন বা কেমিক্যাল দিয়ে লেখা, নামফলক, সাইনবোর্ড, এলইডি, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদির মাধ্যমে অবৈধভাবে বিজ্ঞাপন প্রচারের বিরুদ্ধে শুধু সতর্ক করা হয়। যদিও গত এক বছরে এসবের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. সেলিম রেজা বলেন, দৃশ্যদূষণের বিরুদ্ধে কিছু ইতিবাচক প্রচারণা ও ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছে। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নগরবাসীকে সচেতন করা হয়েছে। নগরীতে যারা বেশি পোস্টার লাগান এরকম কয়েক জনকে চিহ্নিত করে ব্যক্তিগতভাবে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসির সূত্র মতে, নির্ধারিত স্থানে পোস্টার লাগাতে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে প্রতি ওয়ার্ডে ৫-১০টি করে বোর্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেসব বোর্ডে পোস্টার লাগানোর স্থানও নির্ধারণ করা হয় যাতে দৃশ্যদূষণ কমে আসে। তবে সে উদ্যোগের বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএনসিসির সিইও বলেন, ঢাকাকে দৃষ্টিনন্দন স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ও চিঠি দিয়ে প্রথম দফায় উদ্বুদ্ধকরণ ও সচেতনতার কাজ শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, পরবর্তী প্রজন্ম ছাড়াও বিদেশি পর্যটকদের কাছে মহানগরীর প্রদর্শনীটা জরুরি। গণপরিষদের মালিক কিন্তু জনগণ। কোনো মেয়র, এলাকার মাস্তান বা বিজ্ঞাপনী সংস্থা নয়। তাই তাদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। বছর কয়েক আগে মহানগরীতে বিজ্ঞাপনবিষয়ক নৈতিক গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছিল। যার সঙ্গে লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন সেক্টরের মানুষ যুক্ত ছিলেন। তবে উদ্যোগটি আটকে আছে সেখানেই।
