জগতের নিয়মই এমন। কথায় কথায় বলা হয়ে থাকে, অ্যায়সা দিন নহি রহেগা। আসলেই দিনগুলো একইভাবে বয়ে যায় না। দীর্ঘ এক যুগ আধিপত্য বজায় রাখার পর সাম্রাজ্য হারালেন সাকিব আল হাসান। আইসিসির অলরাউন্ডার র্যাংকিংয়ের ১ নম্বর থেকে নেমে এসেছেন ৬ নম্বরে। এটা অভাবিত কিছু নয়। ব্যাটসম্যান হিসেবে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেরা ৩০ জনের মধ্যেও তিনি নেই।
দেশের হয়ে তার আগে আছেন তৌহিদ হৃদয়, লিটন দাস ও নাজমুল হোসেন শান্ত। ১১১ রান নিয়ে তিনি চতুর্থ। আর বোলার হিসেবে তাকে খুঁজতে হয় টর্চ লাইট জ্বালিয়ে। উইকেট নিয়েছেন সর্বসাকুল্যে তিনটি। এ কোন সাকিব? এই সাকিবকে তো আমরা চিনি না। তিনি মাঠে নামবেন আর তার ব্যাট ঝলক দেখাবে না, কিংবা বলের ঘূর্ণিতে উইকেট মিলবে না, এমনটা সচরাচর ঘটে না। কখনো কখনো দুটোরই সম্মিলন ঘটে।
বিগত অনেকগুলো বছর তাকে এমন দাপটের সঙ্গেই তো খেলতে দেখেছি। সে কারণেই তো তিনি ছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। এখন কোনো সংস্করণেই তার শ্রেষ্ঠত্ব নেই। যা কিছুই হোক না কেন, মাঠে নেমে বাজিমাত করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি ছিল না। কত কত ম্যাচের জয়ের নায়ক তিনি। কত অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। একটা বিশ্বকাপ চলে গেল, অথচ একটি ম্যাচ ছাড়া তার উপস্থিতি টেরই পাওয়া গেল না! ২০ মাস পর তিনি দেখা পেয়েছেন সবেধন নীলমণি ফিফটির! এ কীভাবে সম্ভব? এমনকি এই চর্মচক্ষুতে দেখতে হয়েছে, তিনি মাঠে আছেন, অথচ তাকে বল করতেই দেওয়া হয়নি! এটাকে কী বলা যায়? বেলা শেষের গান? তাহলে সাকিবের সেই সোনালি দিনগুলো কি হারিয়ে গেছে? ফুরিয়ে গেছে কি তার বিস্ময়কর ম্যাজিক্যাল পাওয়ার?
একজন সাকিব আল হাসান ব্যর্থ হলে কিংবা তার ফুরিয়ে যাওয়ার কথা শুনলে আমাদের ভালো লাগে না। একদমই ভালো লাগে না। তিনি আমাদের কত বড় অমূল্য সম্পদ, সেটা তো কারোই অজানা নয়। তার মতো আর কেউ বিশ্বসেরা হতে পারেননি। তাকে 'গড গিফটেড ট্যালেন্ট' না বলার কারণ নেই। ১৮ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিন সংস্করণের ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বাধিক বার জয়ের উৎস তিনি। বাংলাদেশের পক্ষে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সর্বাধিক বার প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ, বোলিংয়ে তিন সংস্করণের ক্রিকেটেই সর্বাধিক উইকেট এবং টেস্ট ও ওয়ানডেতে তৃতীয় ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সর্বাধিক রান তার। বিশ্ব ক্রিকেটে সেরাদের একজন। এমন কৃতিত্ব আর কার আছে?
এ তো গেল পরিসংখ্যানগত তথ্য। এর বাইরেও রয়েছে অনেক কীর্তি ও গৌরব, যা নির্ণিত হয় হৃদয় দিয়ে। আছে অগৌরবের ঘটনাও। সব মিলিয়ে তিনি এক ও অপ্রতিম। অযুত মানুষের স্মৃতিতে রয়ে যাবেন চির দিন। তিনি আমাদের যা দিয়েছেন, তা আর কেউ দিতে পারেননি। আগামীতে আরেক জন সাকিব কবে আসবেন, আমরা জানি না। তবুও একটা সময় তো থেমে যেতে হয়। থেমে যাওয়াটা প্রধানত দুই রকম হতে পারে। একটি হচ্ছে, মানসম্মত পারফরম্যান্স না হওয়ায় দল থেকে ছিটকে পড়া আর অপরটি হচ্ছে, নিজের মন যখন আর খেলতে সায় না দেয়, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া। সাকিবের মন এখন কী বলে, তা অবশ্য কারো জানার কথা নয়।
সাকিব বাংলাদেশের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সেরা ক্রিকেটার। ক্রিকেটানুরাগীরা চাইবেন না, অসম্মানজনকভাবে তার বিদায় হোক। সেটা বোধকরি তিনিও প্রত্যাশা করেন না। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষে যেভাবে হেরেছে, সে কারণে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে আগের সাফল্য। এখন সবাই বাংলাদেশের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতা নিয়ে অনেক বেশি সরব। অনুরূপভাবে সাকিব যদি যথাযথ সময়ে অবসর না নেন, তাহলে চাপা পড়ে যেতে পারে তার কীর্তি, তার গৌরব, তার মহিমা। যদিও পরিসংখ্যানের পাতা থেকে তাকে মুছে ফেলা এত সহজ নয়। তারপরও সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলে তিনি সমালোচকদের টার্গেটে পরিণত হবেন। এমনিতেই দেশের জন্য অনেক সম্মান ও সুনাম বয়ে আনলেও তা যতটা না আলোচনা হয়, তার চেয়েও বেশি হয় তার অকীর্তি নিয়ে। কেন যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অন্যের যশ নয়, অপযশ নিয়ে তুলোধুনো করতে আনন্দ বা মজা পান। হতে পারে এটা তাদের স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। সাকিব কি তা জানেন না?
যে কারণেই হোক, বেশ কিছু দিন ধরে সাকিব আল হাসান আগের ফর্মে নেই। হতে পারে খেলায় তেমন মনোযোগ নেই, হতে পারে অন্যত্র অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কিংবা হতে পারে বয়স আর যথাযথ সমর্থন দিতে পারছে না। ইতিমধ্যে পেরিয়ে এসেছেন ৩৭ বছর। যদিও তার সমবয়সী ভারতের রোহিত শর্মা এখনো দাপটের সঙ্গে খেলছেন। দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সামনে থেকে। তিনি খেলাটা উপভোগ করতে পারছেন। কারণ সম্পূর্ণভাবে তার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা এখনো ক্রিকেট। কিন্তু সাকিবের পক্ষে বাস্তবিক কারণেই পুরোপুরিভাবে ক্রিকেট খেলায় মনোনিবেশ করা সম্ভব নয়। কেন সম্ভব নয়, সেটা তার চেয়ে ভালো আর কে জানে? তিনি তো আর অবিবেচক বা অবুঝ নন। কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, সেই বিচারবুদ্ধি বা বুঝ তার যথেষ্ট পরিমাণে আছে। এটা তো তার বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়, তিনি যথাযথভাবে পারফরম্যান্স করতে পারছেন না। র্যাংকিংয়ে তার অবস্থান ক্রমশ নিচের দিকে নামছে। সেটার আরো অবনতি হবে। তেমনটা হলে তার ক্যারিশমা, তার গ্ল্যামার, তার ব্র্যান্ড ভ্যালু হ্রাস পেতে থাকবে। সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বহীন হয়ে যাওয়ার পর একজন সাকিব আল হাসান কি খুবই সাদামাটা হয়ে যান না? তিনি যদি তেমনটা হতে চান, সে ক্ষেত্রে বলার কিছু নেই।
কিন্তু যেখানে দেশের গৌরব ও সম্মানের প্রশ্ন, সেখানে অবশ্যই কিছু বলার থাকে। একজন সাকিব আল হাসান, একজন মাহমুদউল্লাহ কিংবা এমন যারা পড়তি ফর্মে আছেন, যাদের আর বিশেষ কিছু দেওয়ার শক্তি ও সক্ষমতা নেই, তাদের বোঝা বয়ে বেড়ানোর সামর্থ্য কি দেশের ক্রিকেটের আছে? এ বিষয়টি নিয়ে এখনই বোঝাপড়ার সময় এসেছে। ক্রিকেটাররা যদি নিজেদের সামর্থ্য ও সক্ষমতা বুঝতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে আবেগকে বিসর্জন দিয়ে নির্মোহভাবে সিদ্ধান্ত না নেওয়া ছাড়া উপায় কী? দেশের ক্রিকেটের স্বার্থেই কঠোর হতে হবে। হৃদয় বিষণ্ণ আর চোখ অশ্রুসজল হলেও বিনীতভাবে জানিয়ে দিতে হবে, গুডবাই মাই ফ্রেন্ড। ইউ ডিড এ গ্রেট জব। আপনার কাছে জাতি অনেক ঋণী। আপনার অবদানের কথা আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবো। প্রয়োজন হলে আপনার বুদ্ধি-পরামর্শ নেবো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে আপনার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। এখন আপনাকে স্থান ছেড়ে দিতে হবে। অনেকটা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায় বলা যেতে পারে, 'এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান' এ নিয়ে আর দ্বিধা কেন?
