যে কারণে স্মার্টফোনে থাকে না রিমুভেবল ব্যাটারি

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৯, ২০:২২

এখন থেকে এক যুগ আগে যখন নকিয়ার মোটা মোটা ফোনগুলোর অস্তিত্ব ছিল বা স্যামসাংয়ের ফ্লিপিং ফোন — তখন সব ফোনেই একটি কমন বিষয় ছিল আর তা হলো রিমুভেবল ব্যাটারি। ফোনের পেছনের ঢাকনা খুলে ব্যাটারি বের করে ফেলা যেত। কিন্তু আজকের দিনের প্রায় কোনো ফোনেই আর রিমুভেবল ব্যাটারি দেখতে পাওয়া যায় না। কিন্তু কেন? আগের ফোনগুলোতে যখন ইচ্ছা ব্যাটারি খুলে আরেক ব্যাটারি লাগানো যেত। বাইরে কোথায় গেলে একসঙ্গে ২-৩টা এক্সট্রা ব্যাটারি বেঁধে নিয়ে চলে গেলেন আর আরামে ফোন ব্যবহার করা যেত। ব্যাটারি ফুলে গেলে ফেলে দিয়ে নিজে থেকেই সেটা পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল, আরো কতোই না সুবিধা ছিল। নন-রিমুভেবল ব্যাটারির সুবিধার চেয়ে অসুবিধা ছিল বেশি আর এর জন্যই এ জিনিসটি আর কখনোই স্মার্টফোনে ফেরত আসবে না।

 

প্রিমিয়াম ডিজাইন

সময় পরিবর্তন হয়েছে, আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে যখন নকিয়া এন৭০ ফোন ছিল, তখন দামের কথা শুনলে অনেকেই অবাক হয়ে যেত। বর্তমান সময়ে দিনে ১ লাখ টাকা দিয়ে ফোন কিনলেও আমরা আর আশ্চর্য হই না। সময়ের সঙ্গে শুধু ফোনগুলো পাওয়ারফুল হয়েছে তা নয়, ফোনের ডিজাইনেরও অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগের তুলনায় বর্তমান ফোনগুলোতে মেটাল বা গ্লাস ব্যবহার করা হয় প্ল্যাস্টিকের বদলে। রিমুভেবল ব্যাটারিতে পেছনের ঢাকনা গ্লাস বা মেটালের হলে সেটা ভেঙে যাওয়া, বেঁকে যাওয়া, ঢলঢলে হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে, এতে ফোনের প্রিমিয়াম লুকে ঘাটতি আসবে।

বর্তমান দিনের নন-রিমুভেবল ফোনগুলোর ব্যাটারি আলাদা টাইপের হয়ে থাকে। বিশেষ করে অনেক পাতলা, বাঁকানো যাবে, নরম, আলাদা আকৃতির হয়ে থাকে। কিন্তু পূর্বের দিনের রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন ব্যাটারির সঙ্গে শক্ত প্ল্যাস্টিক কেস লাগানো থাকত বা ব্যাটারি শক্ত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া সেটাকে বের করে লাগানোর যোগ্যতা থাকত না। রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো মোটা হয়ে থাকে, এতে ফোনের ডিজাইনও মোটা হয়ে যায়। যেখানে আজকের দিনে আমরা স্লিম ফোনে আগ্রহী।

প্রিমিয়াম ডিজাইন, বিশেষ করে প্রিমিয়াম অনুভূতির অনেক গুরুত্ব রাখে। মানুষ ফোনের পেছনে লাখ টাকাও খরচ করতে রাজি, সেখানে প্রিমিয়াম ডিভাইজ তো হতেই হবে। আর রিমুভেবল ব্যাটারির সঙ্গে প্রিমিয়াম ফিল হওয়াটা অনেক মুশকিলের। নন-রিমুভেবল ব্যাটারি ফোনের পেছনের ঢাকনা খুলতে হয় না, এতে ফোন আগের থেকে অনেক বেশি সিম্পল আর সলিড স্টেট ডিভাইজে পরিণত হয়েছে।

 

আলাদা ফিচারের জন্য জায়গা

নন-রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো সাইজে অনেক মোটা হয়ে থাকে, সঙ্গে প্রোটেকশনের জন্য আলাদা শক্ত কেসও লাগানো থাকতো কিছু মডেল ফোন ব্যাটারির সঙ্গে। যখন কোনো জিনিসকে বারবার বের করবেন আবার লাগাবেন সেটাকে তো মজবুত বানাতেই হবে, কেননা ব্যাটারি অনেক বিপজ্জনক একটি অংশ। আর ফোনের ব্যাটারি ব্লাস্ট হওয়ার উদাহরণ কম নেই দুনিয়াতে।

রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো ফোন থেকে বিরাট অংশ জায়গা খেয়ে ফেলে, যেখানে ইঞ্জিনিয়াররা আরো কুল টেক প্লেস করতে পারতো। নন-রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো অনেক পাতলা হয়, ডিভাইজের ভেতরে কম জায়গা নেয়, এতে ফোনে আরো আলাদা প্রয়োজনীয় মডিউল ইন্সটল করার স্পেস পাওয়া যায়। যেমন—বেশি ক্যামেরা সেন্সর, ওয়্যারলেস চার্জিং, ওয়াটার কুলিং ফিচার, স্টেরিও স্পিকার—ইত্যাদি কুল ফিচারগুলো নন-রিমুভেবল ব্যাটারির জন্যই সহজ হয়েছে।

পাশাপাশি রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো চারকোনা আকৃতির হয়ে থাকে। যেখানে নন-রিমুভেবল ব্যাটারিগুলোকে যে কোনো আকৃতি দেওয়া যেতে পারে। এখন আপনি তো আর এল আকৃতির ব্যাটারি পকেটে নিয়ে ঘুরবেন না, তাই না? — নন-রিমুভেবল ব্যাটারিগুলোর যে কোনো আকৃতির জন্য ফোনের মধ্যে আরো বেশি ব্যাটারি আঁটানো সম্ভব, সঙ্গে ফোনের ডিজাইন ও কার্ভ রাখা সম্ভব হতে পারে।

 

ওয়াটার রেজিস্টান্স

একবার ভেবে দেখুন তো আপনি দিনে কতো ঘণ্টা ধরে ফোন ব্যবহার করেন? আমি তো যতক্ষণ জেগে থাকি প্রায় ততক্ষণই ফোনের সঙ্গে থাকি। প্রত্যেকেরই বর্তমানে কম বেশি সময় ফোনের সঙ্গেই কাটে। এখন আপনিই বলুন, আপনার ফোনের ওপর আপনার হাত থেকে কফি ঢেলে পরার সুযোগ বা হাত থেকে ফোন টয়লেটে পরে যাওয়ার সুযোগ কতোটা বেশি! ফোন সব সময় কাছেই থাকে। তাই যে কোনো সময় আকাশ থেকে বৃষ্টি এসেও হাতের ফোন ভিজিয়ে দিতে পারে।

তাই কোম্পানিগুলো ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোর সঙ্গে ওয়াটার রেজিস্টান্স ফিচার যুক্ত করে দেয়। আপনার ডিভাইজটি যতো সলিড স্টেট রাখা সম্ভব হবে ওয়াটার রেজিস্টান্স ততই ভালো প্রোটেকশন প্রদান করবে। রিমুভেবল ব্যাটারির সঙ্গে আপনার ফোন ওয়াটার রেজিস্টান্স তৈরি করা অনেক মুশকিল কাজ। এখন আপনি নিশ্চয় চাইবেন না আপনার ফোনে পানি ঢুকে ফোনের মাদারবোর্ড পুড়ে পাঁপর বানিয়ে ফেলুক। শুধু ওয়াটার নয়, ডাস্ট রেজিস্টান্স হওয়ার জন্য ও নন-রিমুভেবল ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

আপনি যদি সেই ব্যক্তিটি হোন, যিনি নেক্সট আইফোন বা গ্যালাক্সি ফোনে রিমুভেবল ব্যাটারি আশা করছেন, তো দুঃখিত সেটা আর জীবনেও হয়তো সম্ভব হবে না। ওপরের আলোচনা থেকে হয়তো পরিষ্কারই বুঝতে পারছেন রিমুভেবল ব্যাটারি স্মার্টফোন থেকে কাজের জন্যই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এটা হেডফোন জ্যাক সরিয়ে ফেলার মতো অযৌক্তিক ছিল না। মোটা সাইজ, সস্তা ডিজাইন আরো বেটার যন্ত্রপাতি ফিট করার লক্ষ্যে রিমুভেবল ব্যাটারি স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।