সন্তানের একাকীত্ব অনুধাবন করতে স্বেচ্ছাবন্দি হচ্ছেন বাবা-মায়েরা

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৪, ১৪:৪০

ছোট্ট একটি কক্ষ। এতটাই ছোট যে, আলমারি বললেও ভুল হবে না একে। ছোট্ট একটি ছিদ্র দিয়েই বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ এই কক্ষ থেকে। ভেতরে নেই কোনো ল্যাপটপ কিংবা ফোন। এসব কক্ষকে বলা হচ্ছে ‘সুখের কারখানা বা হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরি’। 

কেবল দেয়ালগুলোই একমাত্র সঙ্গী হতে পারে এই কক্ষের বাসিন্দাদের। তবু এমন একটি কক্ষেই নিজেকে বন্দি করছেন দক্ষিণ কোরিয়ার অসংখ্য বাবা-মা। কয়েদিদের মতো নীল রঙের পোশাক পরিধান করেন তারা। তাই বলে তারা কিন্তু কয়েদি নন। দক্ষিণ কোরিয়ার এসব কেন্দ্রে আসা বাবা-মায়েদের উদ্দেশ্য, ‘একাকিত্বের অভিজ্ঞতা’ লাভ করা।

দক্ষিণ কোরিয়ার বাবা-মায়েদের স্বেচ্ছাবন্দী হওয়ার এই বিষয়টি নিয়ে রোববার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। 

এখানে আসা অধিকাংশ মানুষের অন্তত এমন একজন সন্তান আছে, যে সব ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। তাই বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অনুভূতি কেমন হয়, তা শিখতে অভিভাবকেরা এখানে আসেন। হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরির অধীনে অন্তত ১৩ সপ্তাহের জন্য বন্দী হচ্ছেন তারা। 

‘সুখের কারখানা বা হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরি’। সঙ্গী বলতে খালি দেয়াল ছাড়া আর কিছুই নেই।

দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মাঝে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ৯০-এর দশক থেকেই এই প্রবণতা বাড়তে শুরু করেছিল। দক্ষিণ কোরিয়ায় এ ধরনের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ছেলে-মেয়েদের ‘হিকিকোমোরি’ বলে চিহ্নিত করা হয়। মূলত সমাজ কিংবা মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করে, পড়াশোনা জলাঞ্জলি দিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য নিজের ঘরে একা একা বসবাস করে হিকিকোমারিরা। এমনকি বাবা-মা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ কমে যায়। 

সন্তানের এমন বিচ্ছিন্নতাকে অনুধাবনের জন্য ‘হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরির’ ছোট্ট কুঠুরিতে বন্দী হওয়া বাবা-মায়েদের মধ্যে জিন ইয়ং-হে এবং পার্ক হ্যান-সিল অন্যতম। তাদের মধ্যে মিসেস জিন ইয়ং হের ছেলে গত ৩ বছর ধরেই নিজের বেডরুম থেকেই বের হন না। এর আগে সবকিছুই ঠিক ছিল। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু এমন সময়ই বিচ্ছিন্নতা তাকে সবকিছু থেকে আলাদা করে দিয়েছে। 

অন্যদিকে, পার্ক হ্যান-সিলের ২৬ বছর বয়সী ছেলে সাত বছর আগেই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কয়েকবার বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এখন তিনি আর ঘর থেকেই বের হন না। মিসেস পার্ক অবশ্য ছেলেকে একজন কাউন্সেলরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওষুধ সেবন করতে অস্বীকার করে এবং ভিডিও গেম খেলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ছেলের কাছাকাছি হওয়ার জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করছেন পার্ক। ভাবছেন, নিজে কিছুদিন বন্দী থাকলে হয়তো ছেলের মনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন তিনি।

গবেষণা ও বিশেষজ্ঞের মত

তরুণদের নিজেদের সমাজ থেকে গুটিয়ে নেওয়ার পেছনে নানা ধরনের কারণ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাস্থ্য ও কল্যাণবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে। ১৯ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে আসে তরুণদের গুটিয়ে নেওয়ার কয়েকটি কারণ। সেগুলো হলো বেকারত্ব (২৪.১%), সামাজিক সম্পর্ক (২৩.৫%), পারিবারিক সমস্যা (১২.৪%), স্বাস্থ্যগত সমস্যা (১২.৪%) ইত্যাদি।

এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় আত্মহত্যার হারও অনেক বেশি। এই সমস্যা সমাধানে গত বছর পাঁচ বছরমেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। রাষ্ট্রীয় খরচে ২০ থেকে ৩৪ বছর বয়সী প্রত্যেকের প্রতি দুই বছরে একবার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন মন্ত্রীরা।

তরুণদের নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ুং হি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জেয়ং গো-উন বলেন, কোরিয়ার সমাজে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বড় ধরনের লক্ষ্য অর্জনের চাপ তরুণদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার সময়ে।

ইত্তেফাক/এনএন