সাক্ষরতাই সবকিছু নহে

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৯, ২১:২৯

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী  বর্তমানে দেশে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ৭২.৩ শতাংশ। ২০০৭ সালে এই হার ছিল ৪৬.৬৬ ভাগ। অর্থাত্ এক দশকে এই ব্যাপারে আমাদের অগ্রগতি লক্ষণীয়। স্বল্পোন্নত দেশ হইতে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতার ক্ষেত্রে এই সাফল্য একটি মাইলফলক নিঃসন্দেহে। কিন্তু এখনো দেশে ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ মানুষ নিরক্ষর। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পরও সকল নাগরিককে নিরক্ষতার অভিশাপ হইতে মুক্তি দিতে না পারাটা তো পিছিয়ে থাকারই নামান্তর। সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুযায়ী পৃথিবীব্যাপী ১৫ বত্সর বা তদূর্ধ্ব সামগ্রিক জনসংখ্যা সাক্ষরতার হার ৮৪.১%। অর্থাত্ আমরা সেই মানে এখনো পৌঁছাইতে পারি নাই। পৃথিবীর ৭৭.৫ কোটি পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষরতার হার প্রায় ৭৫% সীমাবদ্ধ রহিয়াছে ১০টি রাষ্ট্রের মধ্যে। তন্মধ্যে ভারত, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া অন্যতম। ইহাতে বোঝা যায়, সাক্ষরতার হার বাড়াইতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখিতে হইবে।

সাক্ষরতার হার কাঙ্ক্ষিত স্তরে না পৌঁছাইবার বড়ো একটি কারণ উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় আমাদের পিছাইয়া পড়া। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও  জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসারে ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন বলিতেছে, সাক্ষরতার হার বাড়াইতে গৃহীত এই প্রকল্পের সুফল মিলিতেছে না। পাঁচ বত্সর অতিবাহিত হইলেও প্রকল্পের অর্ধেক কাজও হয় নাই। ইহা বাস্তবায়নে এনজিও ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে রহিয়াছে সমন্বয়ের অভাব। এনজিও নির্বাচনেও আছে পক্ষাপাতিত্বের অভিযোগ। প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় এই প্রকল্পের ৩৬.২৫ শতাংশ শিখনকেন্দ্র রহিয়াছে। কিন্তু অনেক স্কুলে শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করিতে দেওয়া হয় না। অধিকাংশ শিক্ষাকেন্দ্রে নাই টেবিল, চেয়ার, বেঞ্চ ও অন্যান্য শিক্ষা সরঞ্জাম। প্রকল্পভুক্ত ২৫০টি উপজেলার মধ্যে বর্তমানে ১৩৪টি উপজেলায় ইহার শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রহিয়াছে। তাহা ছাড়া এই কর্মসূচিতে মাত্র ২৫ ভাগ নিরক্ষর ব্যক্তি অংশ নিয়াছে। অর্থাত্ সবাই নিরক্ষর নহে, আধা নিরক্ষর, আগে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় নথিভুক্ত বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা হইতে ঝরিয়া পড়া ব্যক্তিরা রহিয়াছে এই তালিকায়। ইহাতে এক ধরনের শুভংকরের ফাঁকি ধরা পড়ে। এনজিও নির্বাচনে বিলম্ব, প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠ্যবইয়ের জন্য দরপত্র আহ্বানে ব্যর্থতা, ক্রয় কার্যক্রমে দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা ইত্যাদি কারণে প্রকল্পের আশানুরূপ সাফল্য এখনো অধরা। পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক তৈরির কাজ সম্পন্ন করিতে না পারাটাও পিছাইয়া পড়িবার উল্লেখযোগ্য একটি কারণ।

দেশের ১৫-৪৫ বত্সর বয়সি মোট ৪৫ লক্ষ নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে মৌলিক সাক্ষরতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করাই আলোচ্য প্রকল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া-এনজিওদের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশি অনুদান থাকে বলিয়া অনেক সময় এই ধরনের কর্মসূচিতে এনজিওদের প্রাধান্য দিতে হয়। কিন্তু তাহাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারক না করিলে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা অসম্ভব। তাহাদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখিতে হইবে, সাক্ষরতাই সবকিছু নহে। শিক্ষা ও সাক্ষরতার মধ্যে রহিয়াছে বিস্তর ফারাক। তাই ব্যাপক উন্নয়নের জন্য চাই মানসম্পন্ন শিক্ষা। উন্নত জাতিতে পরিণত হইতে হইলে শতভাগ সাক্ষরতা লাভ ও মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের কোনো বিকল্প নাই।