বাঘ বিধবা :নোনা জলের বেহুলা

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৯, ২১:৩৩

শোনো তুমি মা বনবিবি

বলি গো তোমারে

অভাগিনি শরণ নেলে

তোমারই চরণে।

(ও মা) তোমারই চরণে

সুন্দরবনের ত্রাতা বনবিবি। সুন্দরবন ও এর আশপাশের মানুষ বনবিবির নাম নিয়ে তাঁর পূজা দেয়। এরপর তারা বনে প্রবেশ করে। তার পরও অনেক সময় শেষরক্ষা হয় না। বনজীবীদের স্ত্রীরা যুগ যুগ ধরে বনবিবিকে সন্তুষ্ট রাখতে এ গান গায়। তারপর তারা স্বামীদের বনে পাঠায়। বনজীবীরা যখন বনে যায়, ভয়-ডর ফেলেই যায়। যদিও হঠাত্ বাঘের মুখে পড়লে তাদের করার কিছু থাকে না। সুবিধামতো পড়লে বাঘও বনজীবীদের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যায়। তবে সে ঘটনা হাতেগোনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাগ্যহীন মানুষগুলো বাঘের পেটে যায়। যখন এ খবর লোকালয়ে আসে, কান্নাকাটির রোল পড়ে। অথচ দোষী সাব্যস্ত হয় মৃতের স্ত্রী! সমাজ তার নাম দেয় ‘বাঘ বিধবা’। ‘অপয়া’ ‘কুলটা’ ‘রাক্ষস’—তখন অনেক নাম হয় এই বাঘ বিধবাদের।

কারো স্বামী মারা গেলে বউ বিধবা হবে। আর বিধবা তো বিধবাই। এখানে আর এক কাঠি যোগ করে বলা হয়—বাঘ বিধবা। যদি কোনো বিবাহিত পুরুষ বাঘের পেটে চলে যায়, তখন বাড়িতে তার স্ত্রী-সন্তানের যে কী অবস্থা হয়, তা বলার মতো নয়। স্ত্রীর তখন সমাজে ঠাঁই হয় না। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ অবস্থায় মৃতের ছেলেমেয়েরাও থাকে কমবয়সি। ফলে ছোটো ছোটো সন্তান নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ান বাঘ বিধবারা। পথের সঙ্গী হিসেবে তখন তারা কাউকে পান না। যেহেতু বাঘের আক্রমণে মৃতদের বনে যাওয়ার অনুমতিপত্র থাকে না, তাই তাদের স্ত্রী-সন্তান পরবর্তী সময়ে সরকারি সহযোগিতা থেকেও বঞ্চিত হন। সমাজচ্যুত হয়ে তারা অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিয়ে দিন যাপন করতে থাকেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোর একটি বড়ো অংশ কুসংস্কারের আঁধারে ডুবে আছে। একসময় স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকে সহমরণে যেতে হতো; বাঘ বিধবাদের অবস্থা দেখলে সে কথাই মনে পড়ে। সুন্দরবনে প্রবেশের আগে বনজীবীরা বনবিবির পূজা করে। এটা স্থানীয় সংস্কৃতি। কিন্তু বাকিটা শুধুই কুসংস্কার। যেমন কারো স্বামী সুন্দরবনে গেলে সেই নারী অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না, চুল আঁচড়াতে পারেন না, এমনকি তিনি চুলে তেলও মাখতে পারেন না। স্বামী যতদিন বনে থাকবে তাদের খোলা চুলে চলাফেরা করা বারণ। এ সময় তারা সাবানও ব্যবহার করতে পারেন না; বা কোনো প্রসাধন। রান্নার জন্য মরিচ পোড়াতে পারেন না তারা। সব ধরনের ভাজা-পোড়া তখন বন্ধ। এতকিছু স্ত্রীদের মেনে চলার পরও যখন কারো স্বামী বাঘের আক্রমণে মারা যান, তখন সব দোষ গিয়ে পড়ে স্ত্রীর ওপর। সমাজ ধরে নেয়, স্ত্রীর ব্রত পালনে কোথাও হয়তো গাফিলতি হয়েছে। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর সমস্ত দায় তাকে বহন করতে হয়।

ভাগ্যের বিড়ম্বনা এখানেই শেষ নয়। ‘অপয়া’ অপবাদ পাওয়া এ নারীদের বেশিরভাগেরই ঠাঁই মেলে না শ্বশুরবাড়িতে। সমাজে থেকেও  তাদের ‘একঘরে’ থাকতে হয়। তারা যদি এ সময় যৌন নির্যাতনেরও শিকার হন, তাহলে দোষের তীর তাদের দিকেই তাক করা থাকে। বিচারে ধর্ষকের কোনো সাজা হয় না। এই ট্র্যাজেডি বহমান। একবিংশ শতকের সমস্ত অন্ধকার যেন সেখানে জীবন্ত পাথরের মতো শুয়ে আছে। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। এই নিবন্ধকারের সঙ্গে কথা হয় কয়েকজন বাঘ বিধবার। তারা বলেছেন, জীবিত থেকেও মৃতের মতো জীবন কাটাতে হচ্ছে। নারী সংঠগন লিডাসের তথ্য মতে, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে এগারো শ বাঘ বিধবা নারী রয়েছেন। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন ১ হাজারেরও বেশি বনজীবী। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাঘের আক্রমণে কারো নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার আলোচিত মুখ সোনামণি। তার দুই স্বামীকে জীবন দিতে হয়েছে বাঘের আক্রমণে। তার মুখ দেখলে কেউ ‘শুভ কাজে’ বের হন না বলে তিনি জানান। সোনামণি জানিয়েছেন, ১৯৯৯ সালে তার স্বামীকে বাঘ খেয়ে ফেলে। সে কারণে কোলের এক মাস বয়সি বাচ্চাসহ তার শাশুড়ি তাকে তাড়িয়ে দেন। তখন তাকে বাচ্চা নিয়ে পথে পথে ঘুরতে হয়েছে। পরে তার দেবর তাকে বিয়ে করে। ২০০৩ সালে তাকেও বাঘে নিয়ে যায়। সোনামণি আর যায় কই! এর পর থেকেই সে হয়ে যায় পরিক্ষীত অপয়া, অলক্ষ্মী, স্বামীখেকো! সকালে উঠে যেন আগে তার মুখ দেখতে না হয়, তাই শাশুড়ি তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। তিনি বলেন, ‘এ জীবন তো মৃত্যুর মতোই। স্বামী গেল বাঘের পেটে, আমাকেও সে মেরে রেখে গেল।’

 আরো আছে। দক্ষিণ অঞ্চল যেখানে বীজ বুনলে একসময় সোনার ফসল ফলত, সেখানে লবণ পানির কারণে মূল কৃষি থেকে উত্খাত হতে থাকে তারা। ভূমিহীন হয়ে যেতে থাকে প্রান্তিক কৃষক। বেকার হয়ে পড়ে বর্গাচাষি ও কৃষিশ্রমিক। বিপত্সংকুল সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকে এলাকার মানুষ। পেশা পরিবর্তন করতে থাকে তারা। এভাবেই সুন্দরবনের প্রান্তসীমায় বনজীবীদের আবাস গড়ে ওঠে। পেশায় তারা সুন্দরবনের জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি, পোনা সংগ্রহকারী। এসব পরিবারের আয়ক্ষম সদস্য যারা সুন্দরবনে যান তারা অনেকেই বাঘ ও কুমিরের আক্রমণের শিকার হন এবং মৃত্যুবরণ করেন।

শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের চারপাশে নদী। এই দ্বীপ জনগোষ্ঠীকে সুন্দরবন, নদী এবং লবণাক্ত কৃষিজমির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। আইলাদুর্গত গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামের বাঘ বিধবা ময়না বেগম। পরিবারের সদস্য তিন জন। ময়না বেগম বলেন, ‘লবণ-পানির চিংড়ি ঘের না হলে আমি বাঘ বিধবা হতাম না। আমার স্বামী দিন মজুরের কাজ করত। স্বামী-সন্তান নিয়ে খেয়ে-পরে চলছিল। এলাকার কৃষিজমিতে দৈনিক কাজ করতে পারত। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর থেকে কৃষিজমিতে লবণ পানি তুলে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। ধীরে ধীরে চিংড়ি ঘের বিস্তার লাভ করে। আমার স্বামী কাজ হারাতে থাকে আর কপাল পুড়তে শুরু করে আমার। কোনো কাজ না থাকায় সে সুন্দরবনে মধু কাটতে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। এখন নদীতে জাল টেনে চলে আমার জীবন।’

গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামের বাঘ বিধবা খালেদা আক্তার। তিনি বলেন, ‘এলাকায় চিংড়ি ঘের বেড়ে যাওয়ায় আমার স্বামীর কাজের অভাব দেখা দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে সে সুন্দরবনে যায়। আমি নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু পেটে যে বড়ো ক্ষুধা। তার পর থেকেই চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে শুরু হয় আমার কষ্টের জীবন। একমাত্র মৃত্যু পারে এমন জীবন থেকে বাঁচাতে।’

n লেখক : সাংবাদিক