বাংলাদেশে বর্তমানে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে এটা পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে। প্রতিনিয়ত খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, অপহরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে। যা সবাইকে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে আবদ্ধ রাখছে। অতিসম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় ৬ বছরের শিশু সায়মাকে ধর্ষণ ও হত্যা করার ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পাশের বাসায় খেলতে গিয়েছিল ছোট্ট সায়মা। বাড়ির ছাদ দেখানোর কথা বলে কেজি শ্রেণিতে পড়া এই শিশুটিকে ধর্ষণ ও তারপর নির্মমভাবে হত্যা করে এক যুবক। মানুষের মনুষত্ব বোধটাও হারিয়ে গেছে তা না হলে কারো যৌন লালসার শিকার কীভাবে ছোট্ট শিশুটি হয়? শুধু সায়মা নয় প্রতিনিয়ত এরূপ অসংখ্য কন্যাশিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। যারা ধর্ষণের প্রধান কারণ নারীর পোশাককে বোঝাতেন শিশু সায়মা ধর্ষণ তাদের জন্য জ্বলন্ত প্রমাণ। বর্তমানে মানুষ ভুগছে নিরাপত্তা হীনতায়। রাস্তাঘাটে, ঘরে-বাইরে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা—কোথাও নিরাপদ নই আমরা। এভাবে আর কতদিন? একটি স্বাধীন দেশের এরূপ বেহাল কারোই কাম্য নয়। দেশে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে। স্কুল, কলেজ কিংবা মাদ্রাসার ছাত্রী প্রতিনিয়ত নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন সেটি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এখানে দোষ আমাদের। বেশ কিছুদিন আগে নুসরাত জাহান রাফি হত্যা সারাদেশে তুমুল ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। দেশের প্রতিটি মানুষ যেন এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। চলছে তার বিচারকার্য। শ্লীলতাহানির বিচার চাওয়াই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল নুসরাত জাহান রাফির। তাই তাকেও মরতে হলো নৃশংসভাবে। শুধু নুসরাত নয় এভাবে হাজারো মেয়েই শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বিপরীতে সঠিক বিচার পাচ্ছে না অধিকাংশ নিপীড়িতরা। অর্থ কিংবা ক্ষমতার প্রভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে দোষীরা। তাই ধর্ষণ ও হত্যা বাংলাদেশের নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত দিন যাচ্ছে শিশু, কিশোরী ও নারী ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, প্রতিমাসে গড়ে ৫৫টি মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ১৭৬টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৫৫টি করে এবং মার্চে ৬৬টি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সেই হিসেবে মাসে গড়ে ৫৫টির বেশি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েই মুক্তি পায়নি অনেকে। মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয় তাদের। বর্তমানে দেশের চিত্র এমন হয়ে গিয়েছে যে, ঘরে কিংবা বাইরে সর্বত্রই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে এবং যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনে। এভাবে চলতে থাকলে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের ভয়ে শিশু ও নারীরা ঘরের বাইরে বের হতে চাইবে না। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় যেতে চাইবে না। তাই ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রণয়ন এখন সময়ের গণদাবি। যারা আমাদের মেয়েদের শিক্ষার আলোয় পরিচালিত করার পথ দেখাবেন তারাই আজ যৌন ক্ষুধার পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠছেন। মুসলিম প্রধান আমাদের দেশে হুজুরদের আলাদা এক সম্মানের চোখে দেখা হয় অথচ আজ অনেকেই দাড়ি-টুপির লেবাসে ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। যদি শিক্ষক ও অভিভাবকগণরাই পদভ্রষ্ট হয়ে পড়েন তাহলে আমরা যাব কোথায়? দেশে শিক্ষক দ্বারা শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। যা সত্যিই উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, ২০১৮ সালে দেশে সাত শতাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মামলায় দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা, সামাজিক মানহানিসহ থানা বা হাসপাতালে উলটো নিজের ওপর দোষ চাপানোর ভয়ে বেশির ভাগ সময় ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নিতে চান না। এছাড়া মামলা তুলে নিতে অপরাধীর হুমকি, আদালতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় হয়রানি করা হয়। তাহলে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য আমাদের ভিকটিমরা কোথায় যাবে? ধর্ষণ বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে বাড়ছেই। মামলার দীর্ঘায়ত, ক্ষমতার প্রভাব আর সমাজে লাজলজ্জার কারণে আসামিরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে আরো কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মামলার দীর্ঘায়ত কমিয়ে কঠোর শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। দোষীরা যেন কোনো অবস্থাতেই ছাড় না পায়—এইদিকে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। দোষীকে দ্রুততম ও কঠোর আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হলেই দেশ থেকে ধর্ষণ, হত্যা, শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা কমবে বলে মনে করি।
n লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।
