অবিরত হালকা ও ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি এবং ভারত থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে টইটম্বুর এখন হাকালুকি হাওর। পানি বেড়ে যাওয়ায় হাওরপাড়ের গ্রামগুলো ডুবেছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট। বন্যায় কারো বসতঘরে হাঁটুপানি, কারো ঘরে কোমরসমান পানি। বাড়ি ঘরে টিকতে না পেরে কেউ ছুটে গেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউবা গেছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। তবে ঝুঁকি জেনেও ঘরে-বাইরে পানির মধ্যেই বেশির ভাগ রয়ে গেছেন ঘরে। ভোগান্তির মধ্যে লড়াই করছেন টিকে থাকার। গত ২০ দিন ধরে এই অবস্থা মৌলভীবাজারের বড়লেখায়। উপজেলার ২৫২টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। ৩০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৫০০ পরিবারের বানভাসী মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এতে এসব গ্রামের মানুষেরা নিজেদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলেও তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছেদ পড়েছে।
এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের স্কুল ও মাদ্রাসা পড়ুয়া সন্তানেরাও আছে। এরকমই একটি আশ্রয়কেন্দ্র হচ্ছে হাকালুকি হাওর পারের ‘হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয়’। এখানে আশ্রয় নিয়েছে বানভাসী ৩২টি পরিবারের মানুষ। তাদের পরিবারের বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ুয়া ২৫ জন শিক্ষার্থী আছে। বন্যার পানিতে তাদের অনেকের বই, খাতা-কলম ভেসে গেছে। বন্যার এই দীর্ঘ সময়ে তাদের পড়াশোনায় ছেদ পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস স্বেচ্ছায় আশ্রয়কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন। শুধু পাঠদানই নয়, শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে বই, খাতা, কলমও কিনে দিয়েছেন। একবেলা তাদের নাস্তারও ব্যবস্থা করছেন। এমন উদ্যোগে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শিশুদের পাশপাশি তাদের অভিভাবকরাও খুশি।
শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, জলমগ্ন হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। বিদ্যালয়ের ভবন ছাড়া ঘোরাফেরা-খেলাধুলারও জায়গা নেই। বিদ্যালয়ের নতুন একাডেমিক ভবনের একটি কক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস। আশ্রয়কেন্দ্রে শিশু শ্রেণি থেকে স্কুল ও মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ২৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। গত ২০ জুন থেকে ধারাবাহিকভাবে বানভাসী এসব শিক্ষার্থী পাঠের সুযোগ পেয়েছে।
প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস তাদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াচ্ছেন। শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যেই তাদের পাঠদান আটকে রাখছেন না। সচেতনতামূলক ক্লাস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করছেন। শুরু থেকেই এ আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন মুর্শিবাদকুরা গ্রামের খালেদা বেগম নামের এক গৃহিণী। তিনি শিক্ষকের প্রশংসা করে বলেন, ‘বাড়ি-ঘর বন্যায় ডুবে গেছে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে স্কুলে এসেছি। হেড স্যার তাদের পড়াচ্ছেন, খাতা-কলমও দিয়েছেন। মনে করেছিলাম বন্যার কারণে ছেলে-মেয়েদের পড়াতে পারব না। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রে এসে সুবিধা হয়েছে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখাইতে পারছি।’
আশ্রয়কেন্দ্রে পড়ছে ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলী। আলী জানায়, ‘বন্যায় আমাদের ঘর ভেঙে গেছে। মা-বাবা স্কুলে নিয়ে এসছেন। এখানেও আমরা পানিবন্দি। মাঠে পানি। হেড স্যার (প্রধান শিক্ষক) আমারে পড়ান। আনন্দে আমরা পড়ি। অনেক কিছু শিখেছি।’
এমন উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস বলেন, দিনের বেলা সব সময় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকি। স্কুলের চারপাশে বন্যার পানি। খোঁজ নিয়ে দেখলাম এখানে বেশ কিছু শিক্ষার্থী আছে। কয়েক জন আমার স্কুলের। অন্য স্কুলেরও আছে। পানিবন্দি অবস্থায় তাদের পড়ালেখায় যাতে বিঘ্ন না ঘটে; এই চিন্তা থেকে পাঠদান শুরু করি। তাদের বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের পাশাপাশি সচেতনতামূলক ক্লাস নিচ্ছি। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও খুশি।
