দেশের দাবা অঙ্গন একেবারেই থমথমে। ৫ জুলাই সন্ধ্যায় হঠাত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান জিয়ার মৃত্যুটা দাবার কারো কাছেই মেনে নেওয়ার মতো লাগছে না। পৃথিবীর এটাই নিয়ম, আসলে চলে যেতে হবে—একথাই সান্ত্বনা পুষে রাখছেন মনে। দাবার মানুষগুলো খুব বেশি মন খারাপ করে আছেন।
জিয়ার জীবনটাই কেটেছে দাবা নিয়ে। জিয়া যখন জীবনসঙ্গিনী হিসাবে তার স্ত্রী লাবণ্যকে পেয়েছেন, সেই মেয়েটিও জীবনের শুরু থেকে দাবায় ছিলেন। জিয়ার মাথার ওপর ছায়া হয়ে ছিলেন লাবণ্য। একমাত্র পুত্র তাহসিন তাজওয়ার জন্ম হওয়ার থেকেই দেখেছেন বাবা ধ্যানমগ্ন দাবার গুটি নিয়ে। সেই থেকে তাহসিনও দাবায় মন দিলেন।
জিয়া তার বাবা পয়গাম উদ্দিনের হাত ধরে দাবায় আসেন আর জিয়ার হাত ধরে খেলতে খেলতে ফিদে মাস্টার খেতাব পেয়েছেন পুত্র তাহসিন তাজওয়ার জিয়া। বাবার স্বপ্ন ছিল গ্র্যান্ডমাস্টার হবে তার ছেলে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন জিয়াউর রহমান জিয়া। জিয়া তার স্ত্রী লাবণ্য এবং একমাত্র পুত্র তাহসিন তাজওয়ার জিয়া একসঙ্গে দাবা ফেডারেশনে আসতেন এবং একসঙ্গে তারা বাসায় ফিরতেন। জিয়াকে কখনোই তার স্ত্রী পুত্রের বাইরে দেখা যায়নি।
দাবার সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন, দাবা বিচারক হারুনুর রশিদ বললেন, ‘জিয়া আর ওর স্ত্রী দুই জনই একসঙ্গে বিদেশেও যেতেন। যেখানেই খেলা হতো তারা একসঙ্গে যাওয়া-আসা করতেন।’
জিয়ার মৃত্যুর দিনে তার স্ত্রী লাবণ্য পুত্র তাহসিনকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিলেন। বলছিলেন, ‘জিয়া আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। আমি জিয়াকে ছাড়া থাকতে পারব না। জিয়া চলে গেলে আমিও চলে যাব.....।’ তার কথাগুলো অন্যদের কাদিয়ে দিল।
দেশের পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টার। নিয়াজ মোরশেদ, জিয়াউর রহমান জিয়া, রিফাত বিন সাত্তার, আব্দুল্লাহ আল রাকিব এবং এনামুল হোসেন রাজিব। এই পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টার দেশের অন্য সব খেলোয়াড়ের চেয়ে আলাদা, অন্য সব খেলোয়াড়দের চেয়ে তাদের স্বভাব চরিত্র আলাদা। এরা সবাই কথা বলেন কম। কখনো কোনো আক্ষেপ নেই। অভিযোগ নেই। কথা বলেন কম। খুব নিচু স্বরে কথা বলেন। পাঁচ জনই প্রায় একই রকম। এদের মধ্যে রিফাত বিন সাত্তার একটা ভালো চাকরিতে যোগ দেন।
এই দাবাড়ুরা দাবা খেলার জন্য কখনো সহযোগিতা পেতেন না। গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব জয়ের পরও তারা সেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পাননি। যা দেখে নতুন দাবাড়ুরা এগিয়ে আসবে। বিদেশে খেলতে গেলে প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা নিয়ে তাদেরকেই ভাবতে হয়েছে। দাবা ফেডারেশনে সভাপতি এসেছেন সভাপতি গিয়েছেন, কিন্তু দাবার উন্নয়ন কিংবা দাবাড়ুদের উন্নয়ন দেখা যায়নি। কথার ফুলঝুরি সবসময় ছিল এখনো রয়েছে।
জিয়ার জানাজায় যোগ দিয়ে গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজিব বলছিলেন, ‘আমাদেরকে দেখার কেউ নেই।’ ক্রিকেট নিয়ে কতো কথা লেখা হয়। ঘুমকাণ্ড নিয়ে তোলপাড় দেশ। ক্রিকেটে কোনো সাফল্য নেই তবুও কতো মাতামাতি। কিন্তু দাবাড়ুদের জীবন তাদের এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা, তাদের স্বপ্ন নিয়ে দেখার কেউ নেই। প্রচার না থাকলে স্পন্সর আসে না। প্রচার না থাকলে কারো নজরও থাকে না। পাশের দেশে দাবাড়ুদের জন্য রয়েছে কতো সুযোগসুবিধা। আর দেশের দাবাড়ুরা পকেটের টাকা খরচ করে খেলতে হয়। বাবা মা স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু আর্থিক কারণে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়। সম্প্রতি ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপন অবশ্য জানিয়েছেন তিনি দাবার জন্য উদ্যোগ নেবেন। এক বছর প্রশিক্ষণ নিতে কত খরচ হয় তা জানাতে বাজেট চেয়েছেন দাবা ফেডারেশনের কাছে।
