বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎস্যদের বিরুদ্ধে চিকিৎসা সেবায় মনোনিবেশ না করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমান পরিচালক গত তিন বছরে এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার অফিস আদেশ দিলেও অনেক চিকিৎসকই তাতে কর্ণপাত করেননি। অবশেষে সম্প্রতি এ বিষয়ে ৫ জন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে চিঠি ও ১৭ জনকে শোকজও করা হয়েছে।
যদিও চিকিৎসকরা পরিচালকের অধীনে নন, তবুও তিনি কলেজ অধ্যক্ষকে সঙ্গে নিয়ে এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। এতে চিকিৎসকরা মেডিকেলমুখী না হয়ে উল্টো অনিয়মের প্রতিবাদকারী সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভান্ডার) ডা. মো. রেজওয়ানুর আলমকে চরমভাবে হেনস্থা করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। কেবল হেনস্থাই নয় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে ৭ দিনের বাধ্যতামূলক ছুটির কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে উপপরিচালকের কক্ষে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাউন্ড দেওয়ার বিষয় নিয়ে উপপরিচালক মনিরুজ্জামান শাহীন ও উপাধ্যক্ষ ডা. জি এম নাজিমুল হক কথা বলছিলেন। এ সময় সহকারী পরিচালক রেজওয়ানুর আলমও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে উপাধ্যক্ষ উত্তেজিত হয়ে রেজওয়ানুর আলমকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আমার অফিসে ছিলাম। তখন পাশের রুমে বাকবিত্লা শুনে সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের ভাইস প্রিন্সিপাল ও সহকারী পরিচালকের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। আমি তাদের শান্ত করি।’
সহকারী পরিচালক রেজওয়ানুর আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘চিকিৎসকদের বিকেলে ও রাতে রাউন্ড দিতে বলায় উপাধ্যক্ষ জিএম নাজিমুল হক আমাকে অকথ্য গালিগালাজ করে। এটাই শেষ নয়, কতিপয় চিকিৎসক নেতা আমার উপর হামলা চালাবে বলে আমাকে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে দ্রুত মেডিকেল ত্যাগ করেন। আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে ৭ দিনের ছুটি দেওয়া হয়।
তবে এ বিষয়ে উপাধ্যক্ষ ডা. জি এম নাজিমুল হকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অধ্যক্ষ ডা. মো. ফয়জুল বাশার বলেন, ‘যাদের নিয়ে কথা হচ্ছে তারা একে অপরের শিক্ষক-ছাত্র। একজন ছাত্র একজন শিক্ষকের সঙ্গে কতটাইবা বেয়াদবি করতে পারে। এরই মধ্যে আমি ও পরিচালক বসে সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি।’ তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বললেও পরবর্তী সময়ে মেডিকেলের পরিচালক বরাবর একটি চিঠিতে উপাধ্যক্ষের সঙ্গে অসদাচরণের জন্য সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে জন্য ‘অতিব জরুরী’ চিঠি দেন অধ্যক্ষ। চিঠি পেয়েই পরিচালক তিন দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর আদেশ দিয়ে চিঠি দেন ডা. রেজাওয়ানুর আলমকে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে, সহকারী পরিচালক পদে ডা. মো. রেজওয়ানুল আলম যোগদানের মাত্র ৫ মাসের মধ্যে চিকিসত্কদের মেডিকেলমুখী না হওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় তার বিরুদ্ধে তৎপর হয়ে উঠেছে হাসপাতালের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যে কোনো উপায়ে তাকে মেডিকেল থেকে সরানোর জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছেন। কেননা গত ৫ মাসে তিনি সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নিয়েছেন আইনানুগ ব্যবস্থা। এই সিন্ডিকেটই উপাধ্যক্ষর সঙ্গে তার বাকবিত্লার জেরে তার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে পড়েছে।
উল্লেখ্য, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দৈনিক গড়ে ২ হাজার রোগী ভর্তি থাকলেও তাদের ভরসা কেবল ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সরা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় ইন্টার্ন, নার্স থেকে শুরু করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণেই চলে সেবা কার্যক্রম। এতে করে কাগজে-কলমে এক হাজার বেডের এ মেডিকেলের ৩৭টি ওয়ার্ডে দৈনিক গড়ে ২ হাজার রোগীকে চিকিৎসা নিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। এসব ওয়ার্ডগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে প্রত্যেক ওয়ার্ডে শিফট ভাগ করে দায়িত্বরতরা নিজেরাই নিয়ম-কানুন তৈরি করে রেখেছেন। ছুটির দিন ছাড়া অন্যান্য দিনে দিনের বেলায় হাসপাতালের পরিচালকসহ অন্যান্যরা থাকায় রোগী ও স্বজনরা দৌড়-ঝাপ কিংবা বিভিন্ন পরিচয়ে সামান্য চিকিৎসা সেবা পেলেও বিকেলের পর পুরো হাসপাতাল চলে যায় অসাধু কর্মচারীদের দখলে।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকগণ তার অধীনে না থাকলেও মেডিকেলে রুটিন করে রোগী দেখা তাদের দায়িত্ব এবং এ বিষয়টি তিনি বার বার তাদেরকে জানিয়েছেন। এক বছর ধরে সকাল ৯টায় এবং সন্ধ্যায় সুবিধামত সময়ে সকল অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকগণকে হাসপাতালে এসে নিয়মিত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ঐ চিঠির পরও কেউ তাতে কর্ণপাত না করায় পরবর্তী সময়ে কলেজের অধ্যক্ষসহ তিনি যৌথ স্বাক্ষরে চিঠি দিলেও সুফল মিলছে না। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে যৌথ স্বাক্ষরে পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোসহ ১৭ জনকে শোকজ করা হয়েছে।
পরিচালক বলেন, মুমূর্ষু রোগীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন, তারা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সেবায় সন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়। আর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তো অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকদের কাছ থেকে চিকিৎসা দেয়ার বিষয়টি শিখবেন। তাই চিকিৎসকরা হাসপাতালমুখী না হলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
