প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি চাইলে আন্দোলন না করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি মেনে নিতেই হবে। কারণ দাম বাড়ানোর পরও বছরে সরকারকে ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গতকাল সোমবার বিকালে গণভবনে সদ্য সমাপ্ত চীন সফর নিয়ে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অর্জন ও সফলতা তুলে ধরতে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। বাম-ডান এক হয়েছে: গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে হরতাল এবং ১৪ দলের কিছু নেতার সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলএনজির জন্য খরচ যথেষ্ট বেশি পড়ে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারপরও বহুদিন পর হরতাল পেয়েছেন, এটা পরিবেশের জন্য ভালো। এলএনজি আমদানিতে খরচ বাড়ায় ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি জানান। যারা বলছেন ভারতে গ্যাসের দাম কমানো হয়েছে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানী খরচ হয় ৬১ টাকা ১০ পয়সা। ভারতে গৃহস্থালির জন্য স্থান ভেদে গ্যাসের দাম ৩০-৩৭ টাকা প্রতি ঘনমিটার। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ দাম মাত্র ১২ দশমিক ৬০ টাকা। শিল্পে আমাদের গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা, সেখানে ভারতে এটির দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা। বাস্তবে ভারত বছরে দুইবার গ্যাসের দাম বাড়ায়, এটাই তাদের নীতি। পয়লা এপ্রিল এবং অক্টোবরে গিয়ে তারা গ্যাসের দাম সমন্বয় করে। তিনি বলেন, ৬১ টাকা দিয়ে এলএনজি নিয়ে এসে আমরা সেটা বিক্রি করছি মাত্র ৯ টাকায়। তারপরও আন্দোলন! এই ইস্যুতে বাম আর ডান মিলে গেছে।
অন্যের প্রদেশ কখনোই নেব না:মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের ভূখন্ডে যুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের যে সীমানা আছে, আমরা তাতেই খুশি। অন্যের জমি নিয়ে আসা বা অন্যের কোনো প্রদেশ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া- এটা আমরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করি। প্রত্যেক দেশ তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে তারা রাখাইন স্টেট জুড়ে দেয়ার প্রসঙ্গ তুলছে কেন? মার্কিন কংগ্রেসম্যান ম্যান শ্যারণের এ ধরণের কথা বলা অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় কাজ বলে আমি মনে করি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এটা চাই যে, মার্কিন কংগ্রেসম্যান এ ধরনের উল্টো-পাল্টা কথা না বলে বরং মিয়ানমার যেন তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই কথা বলেন ও কাজ করেন। সেটাই হবে মানবিক দিক। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, যেখানেই তারা হাত দিয়েছে সেখানেই তো আগুন জ্বলছে। কোথাও তো শাস্তি আসেনি, বরং জঙ্গিবাদ-অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এই অঞ্চলে আমরা একটু শান্তিপূর্ণভাবে থাকার চেষ্টা করছি। এখানেও তাদের আগুন লাগানোর প্রচেষ্টা! রোহিঙ্গা সংক্রান্ত অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন বলেছে, বিষয়টা তারা বিবেচনা করবে। এটা কী সুখবর মনে হচ্ছে না? মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারকে সম্মত করতে চেষ্টা করবেন বলে দেশটির রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দুইবার মিয়ানমারে পাঠিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে তারা আবারও তাকে মিয়ানমারে পাঠাবে।
ধর্ষণ বন্ধে পুরুষকে সোচ্চার হতে হবে:নারী-শিশু নির্যাতনকারী ধর্ষকদের বিরুদ্ধে পুরুষ সমাজকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। এসব ঘটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ ধরণের কাজ যারা করছে, তারা মানুষ নয়। এ ব্যাপারে পুরুষ সমাজেরও একটা আওয়াজ তোলা উচিত। কেবল নারীরাই চিত্কার করে গেলে হবে না।
বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র নীতিই হচ্ছে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারোর সঙ্গে বৈরিতা নয়। কার সঙ্গে কার কী সমস্যা, কার সঙ্গে কার কী যুদ্ধ- সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। এক সময় চীন আমেরিকার বড় বন্ধু ছিল। এখন আবার তাদের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ। আমরা কারো সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। কারো ঘরে আগুণ লাগলে আলু পুড়িয়ে খাব, এটা চিন্তা করি না। বরং কোন দেশের সঙ্গে আমরা কতটুকু অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাব, সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারবো- সে দিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা চলি।
বেশি বয়সীদের বিসিএস প্রসঙ্গ:চাকুরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ না করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনটি বিসিএসে দেখা গেছে যারা বেশি বয়সী, তাদের পাসের হার খুবই কম। তিনি বলেন, এখন জন্ম নিবন্ধন হয়। নিয়মিত পড়াশোনা করলে ১৬ বছরে এসএসসি পাস করে। এরপর ২ বছরে এইচএসসি। এরপর ৪ বছরে অনার্স ও ১ বছরে মাস্টার্স করলে ২৩ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিতে পারে।
ক্রিকেটের উন্নতি: বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পারফরমেন্স প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল যথেষ্ট উন্নতি করেছে। বিশ্বকাপ পাওয়া একেকটা নামি-দামি দলের সঙ্গে খেলা কম কথা নয়। সাকিব আল হাসান তো বিশ্বে একটা স্থান করে নিয়েছে। মোস্তাফিজ একটা স্থান করে নিয়েছে। খেলা এমন একটা জিনিস যার জন্য অনেক সময় ভাগ্যের সহায়তাও লাগে। আমি নিজে খেলা দেখেছি। আমাদের ছেলেদের ধন্যবাদ জানাবো, তারা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে।
এর আগে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সাম্প্রতিক চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীন দু’ দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
