তিন দিনের টানা ভারী বর্ষণে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ধসের আশঙ্কায় চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে দু-তিন দিন আগেই মাইকিং করে নির্দেশ দেয়। কিন্তু তারপরও সেখানে বসবাসকারীরা বাসস্থান ছেড়ে তাদের জন্য যে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে সেখানে যায়নি। এরই মধ্যে গতকাল সোমবার দুপুরে কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন পরিষদের কলাবাগান এলাকায় পাহাড়ধসে শিশুসহ দুজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছে। নিহতরা হলো সূর্য মল্লিক (৩) ও তাহমিনা (৩০)। অন্যদিকে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ভারী বৃষ্টিতে বসতঘরের দেওয়াল ধসে মুহাম্মদ হারুন রশিদ হারুন (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ভোর ৪টার দিকে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হাফালিয়াকাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম জানান, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কলাবাগান এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশের একটি ঘরের ওপর বিকট শব্দে পাহাড় আছড়ে পড়ে। এ সময় দুটি পরিবারের দুজন নিহত ও তিনজন আহত হয়। স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় কাপ্তাই ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি ও উপজেলা প্রশাসন উদ্ধার তত্পরতার কাজ শুরু করে।
এদিকে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও বৃষ্টির পানির তোড়ে লংগদু-দীঘিনালা, রাঙ্গামাটি-বান্দরবান, রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কিন্তু কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজন আসেনি।
জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ জানান, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দুই মাস ধরেই জনগণকে সচেতন করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা মাঠে নেমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। নিহত দুজনের জন্য ৪০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘রাঙ্গামাটি পৌর শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বেশ কিছু এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু বারবার অনুরোধের পরও লোকজন বাড়িঘর ছাড়ছে না। তাই আমি সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের কাজে লাগিয়ে দিয়েছি, দ্রুত যাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিয়ে আসে।’
রাঙামাটির স্বেচ্ছাসেবী মো. আবু তৈয়ব জানান, রাঙ্গামাটির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা মনোঘর, যুব উন্নয়ন এলাকা, শিমুলতলী, ভেদভেদী, সনাতনপাড়া, লোকনাথ মন্দিরের পেছনের অংশ, রূপনগর, আরশিনগর, টিভি সেন্টার এলাকা, আউলিয়ানগরসহ বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে কাজ করছে বেশ কয়েকটি মোবাইল টিম।
২০১৭ সালের ১১ জুন থেকে টানা বর্ষণের ফলে ১৩ জুন রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় পাঁচজন সেনাসদস্যসহ ১২০ জন নিহত হন। পরের বছরের ১১ জুন নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড়ধসে মৃত্যু হয় ১১ জনের।
অবিরাম বর্ষণে বান্দরবানের রুমা-থানচি উপজেলা সড়কের নয়মাইল নামক স্থানে পাহাড়ধসে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সড়ক থেকে ধসে পড়া পাহাড়ের মাটি সরিয়ে সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু করেন। এছাড়া শহরের ইসলামপুর, কালাঘাটা, বনরুপাপাড়া এবং লামা-সূয়ালক, বান্দরবান-রাঙ্গামাটিসহ অভ্যন্তরীণ সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
অব্যাহত বর্ষণে বান্দরবানের ইসলামপুর, শেরেবাংলা নগরসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানি বেড়ে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রবিবার সকাল নয়টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবানে ১৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বান্দরবানের মৃত্তিকা পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম।
নদীতে পানি বেড়ে বিপজ্জনক হয়ে পড়ায় বান্দরবানের থানচিতে ট্যুরিস্ট স্পট রেমাক্রি-তীন্দু-বড়মদক রুটে সব ধরনের নৌ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এদিকে দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার সাতটি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাইক্লোন সেন্টারে ১২৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া দুর্গতদের ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মো. দাউদুল ইসলাম বলেন, অবিরাম বর্ষণে বন্যা-পাহাড়ধসের শঙ্কা রয়েছে। সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে যারা ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ছেড়ে যাবে না, তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
চট্টগ্রামে শহর ও জেলায় পাহাড়গুলোতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে কয়েক লাখ লোক বসবাস করছে। তাদের নিয়ে প্রশাসন উদ্বিগ্ন। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সরিয়ে নিতে মাঠ প্রশাসন এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক ও এলাকায় মাইকিং করেছে।
চট্টগ্রামের শহর এলাকার পাহাড় ছাড়াও জেলার সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, পটিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারী উপজেলায় পাহাড়ে প্রচুর অবৈধ বসতি রয়েছে।
