রাজধানীর পাশে সাভার জনপদের ওপর দিয়ে বহমান বংশী নদী। কিন্তু এলাকার প্রভাবশালীদের কারণে এ নদীর অস্তিত্ব এখন সংকটের মুখে পড়েছে। কেননা নদীর দুই পাশের শত শত বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে এলাকার প্রভাবশালীরা। তাদের সঙ্গে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজসে চলছে এই দখল বাণিজ্য- এমনই অভিযোগ সাভারের অধিকাংশ মানুষের।
ইতিপূর্বে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এসব সরকারি সম্পত্তি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ নির্দেশের আলোকে জেলা প্রশাসক সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভূমি কর্মকর্তাকে অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি ও চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। আর ওই তালিকায় উঠে এসেছে স্থানীয় প্রভাবশালী একাধিক রাজনৈতিক নেতার নাম।
এলাকার বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও হাউজিং কোম্পানীগুলো প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এ দখল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দখলকৃত জমির মূল্য কয়েক শত কোটি টাকা বলে জানা গেছে। একসময় যে বংশী নদীতে মালবোঝাই জাহাজ চলতো আজ তা কেবলই স্মৃতি। কারণ নদীর দুই ধার এমনভাবে দখল করে নেওয়া হয়েছে যে এর গতিপথ সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। বংশী নদী দখলমুক্ত করার জন্য পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে মিছিল, মানববন্ধন, সমাবেশ করলেও কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না অশুভ এই দখল প্রক্রিয়া।
নদীর কূল ঘেঁষে অবস্থিত সাভারের নামা বাজার আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে আর ক্ষুদ্র হচ্ছে বংশী নদী। কেননা বাজারের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা নদীর জমি দখল করে সেখানে নির্মাণ করছে দোকানপাট, গুদামঘর, চিড়া ও তেলের মিল, ডাল মিলসহ অন্য কলকারখানা। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ব্যবসায়ীদের নামে অবৈধভাবে জমি লিজ দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে ।
সাভার বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বংশী নদীর পূর্ব পাড়ের ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও বসতবাড়ি। অনেকেই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে সরকারি সম্পত্তি দখল করেছে ও দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, সরকারি সম্পত্তি দখলে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ভূমি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে ভূমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। অনেকে সরকারি সম্পত্তির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভূমি অফিসের সহায়তায় কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি নিজেদের দখলে নিয়েছে। সাভার বাজারের পাশে বংশী নদীর পাড় ঘেঁষে সরকারি খাস জমির সিংহভাগই নামে-বেনামে এবং লিজের মাধ্যমে বেদখল হয়ে গেছে। এই দখল প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে। জানা গেছে, নদীর পাড় ঘেঁষে উত্তর বাজার থেকে দক্ষিণ বাজার পর্যন্ত প্রায় অর্ধকিলোমিটার এলাকার প্রায় ১শ’ একর জমি দখল করে নিয়েছে কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি।
নদী দখল নিয়ে ইতিপূর্বে সাভারের প্রশাসন ও পরিবেশবাদীদের একাধিক সভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, নদী উদ্ধারের জন্য জাতীয়ভাবে কমিটি গঠন করা হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান চলমান রয়েছে। সাভারেও অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হবে। এছাড়া নদী, খাল, জলাশয় ভরাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু অদ্যাবধি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মোল্লা বলেন, প্রভাবশালী কর্তৃক নদী দখল হয়ে যাচ্ছে। তিনি নদী সুরক্ষায় সিএস নকশা অনুযায়ী নদীর সীমানা নির্ধারণের দাবি জানান। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সাভারের সভাপতি অধ্যাপক দীপক কুমার রায় বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্যই নদ-নদী রক্ষা করা প্রয়োজন। ক্রমাগত নদী খাল ভরাট হলে পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
