খুলনার ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড

বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে একাকার রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৪, ০৪:৫৫

দুর্ভোগের শেষ নেই খুলনা মহানগরীর দুটি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। গত শতকের ষাটের দশকের অধিকাংশ স্লুইসগেট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন রূপসা নদীর জোয়ারের পানি প্রবেশ করে লোকালয়ে। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরো চরম আকার ধারণ করে। বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে একাকার হয়ে যায় ঐ দুটি ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ড্রেন উপচে পানি প্রবেশ করে বাসাবাড়ির মধ্যে। ড্রেনের বর্জ্য জমে ছড়ায় দুর্গন্ধ। দিনে-রাতে পানিতে তলিয়ে যায় পথঘাট। এ দুর্ভোগের হাত থেকে মুক্তি চান খুলনা মহানগরীর ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডবাসী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত শতকের ষাটের দশকে নির্মিত খুলনা মহানগরীর ৩০ ও ৩১ ওয়ার্ডের স্লুইস গেটগুলোর অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। তার ওপর অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন দুপুরে রূপসা নদীর জোয়ারের পানি প্রবেশ করে লোকালয়ে। তাছাড়া অপরিকল্পিত সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না করা, উন্নয়ন কাজে ঠিকাদারের ধীরগতিসহ কেসিসির কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়ায় এখানকার মানুষের দুর্ভোগ কাটছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রূপসা নদীর জোয়ারের পানিতে নাকাল খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী রোডের বাসাবাড়ি, দোকানপাট, খুলনা কলেজিয়েট স্কুল, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়। বিশেষ করে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নগরীর টুটপাড়া মেইনরোড, বড় খালপাড়, মোল্লাপাড়া, জিন্নাহপাড়া, টিবি ক্রসরোডসহ ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়। প্রতিদিন দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭টা পর্যন্ত জোয়ারের পানিতে প্লাবিত থাকে এসব এলাকা। পানিবন্দি এসব এলাকার মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের সঙ্গী।

নগরীর টুটপাড়া বড়খালপাড় এলাকার বাসিন্দা সংবাদকর্মী নূরুজ্জামান বলেন, জলাবদ্ধতা আমাদের প্রতিদিনের চিত্র। প্রতিদিন জোয়ারের সময় রূপসা নদীর পানিতে টুটপাড়া বড়খালপাড় এলাকা ডুবে যায়। এর সঙ্গে খালের আশপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকার রাস্তাঘাট ও বাড়ি প্লাবিত হয়ে যায়। হাঁটু সমান এই পানি থাকে দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।

তিনি বলেন, রূপসা নদীর তলদেশ পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া ড্রেনগুলোর তলদেশও ময়লা-আবর্জনা ও পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। রূপসা নদীর পলি খনন ও ড্রেনের সংস্কার করা না হলে দীর্ঘদিনের এ সমস্যা যাবে না।

নগরীর জিন্নাহপাড়ার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, বর্ষা মৌসুমের তিন মাস আমাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। প্রতিদিন দুপুর আড়াইটা থেকে বাড়িতে পানি উঠতে শুরু করে। সেই পানি প্রায় সন্ধ্যা ৬টা-৭টা পর্যন্ত থাকে। আবার রাত আড়াইটা থেকে পানি উঠতে শুরু করে। দুই দফায় প্রতিদিন অন্তত আট ঘণ্টা পানিবন্দি থাকেন তারা। ফলে অমানবিক জীবনযাপনের পাশাপাশি তাদের দিনের অধিকাংশ সময় পার করতে হয় পানির হাত থেকে আসবাবপত্র বাঁচাতে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধারাবাহিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে মূল সমস্যাগুলো হছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের কর্মকর্তারা উদাসীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং কোনো প্রকার জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার মধ্যে নেই। যে কারণে স্লুইসগেটগুলো একেবারেই অচল হয়ে জোয়ারের সময় পানি ঘরে উঠে যাচ্ছে। একেবারে ঘর, বাথরুম, টয়লেট সবমিলে একাকার হয়ে যায়। মানুষের জীবন শুধু অসহনীয় নয়, অসহনীয়তাও চরম পর্যায়ে ছাড়িয়ে গেছে। সুতরাং এ এলাকার মানুষ কেমন করে বসবাস করে এটা চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না।

কেসিসির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আরিফ হোসেন মিঠু বলেন, আমার ওয়ার্ডের ইসলামপাড়া, আমতলা, মোল্লাপাড়া, মুজাহিদপাড়া এবং মতিয়াখালী এলাকা প্রতিনিয়ত নদীর জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। বছর তিন-চার ধরে এমন অবস্থা হচ্ছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক মো. আনিসুজ্জামান বলেন, চলমান উন্নয়নমূলক কাজ শেষ হলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। খুলনা মহানগরীর পানি অপসারণের জন্য সাতটি পয়েন্টে ১৯টি স্লুইসগেট ও ৩৮টি আউটলেট রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি স্লুইসগেটে কাজ চলছে। নগরীর পানি অপসারণের জন্য রূপসায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বুস্টার পাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়ার সমস্যা কেটে যাবে বলে আশা করছি।

ইত্তেফাক/এসটিএম