কোটা আন্দোলন

‘পড়াশোনা শেষে আমাকে অবসর দেবে বলে ছেলেটা চিরতরে অবসরে চলে গেল’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৪, ১৯:২১

‘পড়াশোনা শেষে আমাকে অবসর দেবে বলে ছেলেটা চিরতরে অবসরে চলে গেল’‘আমার ছেলে রিজভীর স্বপ্ন ছিল চাকরি করে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া। প্রায়ই সে বলতো, পড়াশোনা শেষ করে আমাকে অবসর দেবে। কিন্তু ছেলেটা নিজেই চিরতরে অবসরে চলে গেল। আমার রিজভী আর নেই।’ 

কাঁদতে কাঁদতে এসব কথাগুলো বলছিলেন রাজধানী ঢাকার উত্তরায় ১৮ জুলাই মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত নোয়াখালীর তরুণ মাহমুদুল হাসান রিজভীর (২০) বাবা জামাল উদ্দিন। তিনি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত।

ছেলেকে হারিয়ে শোকে মূর্ছা যাচ্ছেন মা ফরিদা ইয়াসমিনও। জ্ঞান ফিরলেও সন্তানের শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘ছেলের অসুস্থতার খবর শুনে ঢাকায় ছুটে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, আমার ছেলের মরদেহ। আমি মরদেহ আনতে যাইনি, গিয়েছিলাম ছেলেকে সুস্থ করতে। এখন আমি কীভাবে আমার ছেলেকে ছাড়া থাকব? আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল? আমাকে কেন সন্তানহারা হতে হলো? আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

মাহমুদুল হাসান রিজভীর বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের চর কৈলাশ এলাকায়। তার বাবা-মা ও ভাই-বোন নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর বার্লিংটন এলাকায় থাকেন। নিহত রিজভীর নানার বাড়ি হাতিয়া উপজেলার হরণী ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামে। সেখানেই শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় তার মরদেহ দাফন করা হয়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মাহমুদুল এসএসসি পাস করেন মাইজদীর পৌর কল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এরপর লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেকট্রনিকস বিষয়ে ডিপ্লোমা শেষ করেন। চলতি মাসেই ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ শুরু করেন রিজভী। ২ জুলাই মা ফরিদা ইয়াসমিন তাকে মেসে রেখে আসেন। মেসে তিন সহপাঠীর সাথে থাকতেন রিজভী।

রিজভীর মামা আজিজুর রহমান জানান, ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় মেসের চার বন্ধুকে নিয়ে নাশতা করতে বের হয়েছিল মাহমুদুল। উত্তরা এলাকার রাজলক্ষ্মীর দিকে যেতেই হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পায়। এ সময় বন্ধুরাসহ আত্মরক্ষায় পালানোর চেষ্টা করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি গুলি রিজভীর মাথায় লাগে। পরে তাকে আহত অবস্থায় স্থানীয় ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যায় তার বন্ধুরা। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রিজভীর মা ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ২ জুলাই ছেলেকে মেসে তুলে দিয়ে এসেছি। মেসে তিন সহপাঠীর সাথে থাকতো রিজভী। ১৮ জুলাই দুপুরে তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। সে জানায়, তার মেসে মাছ-তরকারি কিছুই নেই। তিন দিন ধরে মেস থেকে বের হতে পারছে না। পরিস্থিতি দেখে সন্ধ্যায় নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। মোবাইল ফোনে কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পর ছেলের এক সহপাঠী ফোন দিয়ে জানায়, মাহমুদুল অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ঢাকায় গিয়ে দেখি, ছেলের মরদেহ মর্গে।

রিজভীর পৌর কল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক পানাউল্যাহ বলেন, রিজভী ২০২০ সালে এসএসসি পাস করে। এরপর লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা শেষে ঢাকার উত্তরায় একটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করছিল। তার এমন মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত।

ইত্তেফাক/টিএইচ